দুর্নীতির বিরুদ্ধে একের পর এক আলোচিত অনুসন্ধান চালিয়ে চাকরিচ্যুত হওয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনের চাকরিতে ফেরার পথ খুলেছে।
তাকে জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুযোগ-সুবিধাসহ পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল প্রত্যাহার করেছে দুদক।
ফলে সাড়ে চার বছরের বেশি সময় পর জ্যেষ্ঠতাসহ চাকরিতে ফিরতে আর কোনো আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শরীফ উদ্দিনের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালাহ উদ্দীন দোলন গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, শরীফ উদ্দিনকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে গত বছর আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল দুদক। পরে সেই লিভ টু আপিল প্রত্যাহারের আবেদন করে সংস্থাটি। গত ১৫ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আবেদনটি নিষ্পত্তি করে আদেশ দেন।
আদালতের আদেশে বলা হয়, দুদকের পক্ষে উপস্থিত আইনজীবী লিভ টু আপিলটি আর পরিচালনা না করার নির্দেশনা পেয়েছেন বলে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি না চালানোর কারণে লিভ টু আপিল খারিজ করা হয়।
এ বিষয়ে শরীফ উদ্দিনের আইনজীবী সালাহ উদ্দীন দোলন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করেছেন। অর্থাৎ লিভ টু আপিল প্রত্যাহার হয়ে গেল। জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুবিধাসহ শরীফ উদ্দিনকে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়ে রায় দিয়েছিলেন, তা বহাল রইল।’
তিনি আরও জানান, জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুযোগ-সুবিধাসহ শরীফ উদ্দিনকে চাকরিতে পুনর্বহালের ক্ষেত্রে এখন আর কোনো আইনি বাধা নেই।
এর আগে গত বছরের ৯ জুলাই শরীফ উদ্দিনের চাকরিচ্যুতির আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তাকে জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুবিধাসহ চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল।
যেভাবে আলোচনায় আসেন শরীফ উদ্দিন
দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে প্রায় তিন বছর কর্মরত ছিলেন উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিন। এ সময় সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং ইয়াবা চোরাচালানসহ একাধিক আলোচিত ঘটনার অনুসন্ধান করেন তিনি।
তার অনুসন্ধানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উঠে আসে।
চাকরির মেয়াদকালে প্রায় অর্ধশত মামলা এবং ২০টির বেশি অভিযোগপত্র দাখিল করেন শরীফ উদ্দিন। কক্সবাজারের তালিকাভুক্ত ইয়াবা চোরাকারবারি হাজি সাইফুল করিমের বিরুদ্ধেও মামলা করেছিলেন তিনি।
এছাড়া কক্সবাজারের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার দুর্নীতি অনুসন্ধানে কেন্দ্রীয় ও জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাসহ জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উঠে আসে। রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট জালিয়াতির অনুসন্ধানেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) নিয়োগ, পদোন্নতি ও গ্যাস সংযোগে অনিয়ম নিয়েও অনুসন্ধান করেন শরীফ। পাশাপাশি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করে ১৮২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরি করেন। এসব ঘটনায় একাধিক মামলার সুপারিশ করেছিলেন তিনি।
আলোচিত এসব অনুসন্ধানের মধ্যে ২০২১ সালের ১৬ জুন তাকে চট্টগ্রাম থেকে পটুয়াখালীতে বদলি করা হয়। এর আগে দায়িত্ব পালনের কারণে প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার অভিযোগে থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন তিনি।
পরে ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দুদকের পটুয়াখালী কার্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় শরীফ উদ্দিনকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়।
দুদকের তৎকালীন আদেশে বলা হয়েছিল, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৫৪(২)-তে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে মো. শরীফ উদ্দিন (উপসহকারী পরিচালক) দুদক, সমন্বিত জেলা কার্যক্রম, পটুয়াখালীকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হলো। তিনি বিধি মোতাবেক ৯০ দিনের বেতন এবং প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।’
তার চাকরিচ্যুতির ঘটনায় সে সময় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। অপসারণের আদেশ প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্ট বিধি বাতিলের দাবিতে দুদকের প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে মানববন্ধন করেন সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
যেভাবে চাকরিতে ফেরার পথ খুলল
চাকরিচ্যুতির আদেশ এবং দুদক কর্মচারী বিধিমালার ৫৪(২) বিধির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২২ সালের ১৩ মার্চ হাইকোর্টে রিট করেন শরীফ উদ্দিন।
রিটের শুনানিকালে একই বিধির আওতায় দুদকের আরেক কর্মকর্তা মো. আহসান আলীকে চাকরিচ্যুতির ঘটনায় করা মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকার বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ২৫ মে ওই আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শরীফের রিটের শুনানি মুলতবি করেন হাইকোর্ট।
পরে হাইকোর্টের ওই আদেশ স্থগিত চেয়ে ২০২২ সালের ১৬ জুন আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন শরীফ।
২০২৩ সালের ১৬ মার্চ আপিল বিভাগ দুদকের করা আপিল মঞ্জুর করে রায় দেন। এতে ৫৪(২) বিধি বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া আগের রায় বাতিল হয়।
একই বছরের ২১ ডিসেম্বর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ উল্লেখ করেন, দুদক কর্মচারী বিধিমালার ৫৪(২) বিধি সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুদককে ১২ দফা পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়।
এরপর শরীফ উদ্দিনের করা রিট পুনরায় হাইকোর্টে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হয়। ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রুল জারি করেন আদালত।
চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ৯ জুলাই হাইকোর্ট শরীফ উদ্দিনকে চাকরিচ্যুতির ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির আদেশ আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও শুরু থেকেই বাতিল ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুবিধাসহ তাকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন।
হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে দুদক লিভ টু আপিল করলেও শেষ পর্যন্ত তা আর পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত নেয়। গত ১৫ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত লিভ টু আপিলটি খারিজ করেন।
এর ফলে হাইকোর্টের দেওয়া পুনর্বহালের রায় বহাল থাকায় জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুযোগ-সুবিধাসহ দুদকের চাকরিতে ফেরার পথ খুলেছে আলোচিত সাবেক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিনের।

টেলিগ্রাম ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ । ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ