সংসদ নির্বাচনের দুই বছরের মধ্যে অনুষ্ঠিত কোনো উপনির্বাচনে সরকারি দল তার জেতা আসন হারায়নি। সরকারের শেষ দিকে এসে সরকারি দলের জেতা আসন উপনির্বাচনে বিরোধী দলের জয়ী হওয়ার বিরল দুটি উদাহরণ রয়েছে। বরং বিরোধী দলের জেতা আসন উপনির্বাচনে সরকারি দলের জেতার ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে।
আজ ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে যে ফল হয়েছে তা স্বাভাবিক। অতীতে চারজন নেতা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর, শুন্য আসনে তাদের স্বজনরা খুব সহজে এবং বিশাল ব্যবধানে এমপি হয়েছিলেন। ঠাকুরগাঁওয়ে বিরোধী দলের প্রার্থী ২৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। গত সংসদ নির্বাচনে একই প্রার্থী পেয়েছিলেন ৩৬ শতাংশ ভোট। এ হিসেবে তার ভোট ব্যাংক অটুট আছে। ম্যাসিভ কারচুপি হলে এটা সম্ভব হতো না।
উপনির্বাচনে জাল ভোট বাংলাদেশের ‘নিয়তি’। ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা ইচ্ছামত জাল ভোট দেয়। ঠাকুরগাঁওয়ে আজ অনেক ভোটার কেন্দ্রে গিয়ে জানতে পেয়েছেন তাদের ভোট হয়ে গেছে। মানে তার নামে অন্য কেউ জাল ভোট দিয়ে গেছে। পুলিশ ও প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে থাকে বলে সরকারি দল এটা করতে পারে। জাল ভোট ঠেকাতে পারে শুধুমাত্র বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট। বিরোধী দলের এজেন্টরা উপনির্বাচনে চাপে থাকে বলে, জাল ভোটার এটা দেখে না। কারণ তাকে তো থাকতে হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ে জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ১ লাখ ৩১ হাজার। এত জাল ভোট সম্ভব না। ১০, ২০, ৩০ হাজার হয়ত সম্ভব। আবার কাস্টিং ভোট প্রায় ৬৫ শতাংশ, এটাও একটু বেশি মনে হচ্ছে। যদিও উত্তরবঙ্গে কাস্টিং সবসময়ই বেশি হয়। জাতীয় নির্বাচনে এই আসনে কাস্টিং ৭৭ শতাংশ ছিল। তারপরও উত্তেজনাহীন নির্বাচনে ৬৫ শতাংশ কাস্টিং বেশি। আবার ধারনা কিছু কাস্টিং বেড়েছে জাল ভোটে। তবে এটা নির্বাচনে ফলাফলে প্রভাব ফেলার মত নয়।
তাহলে বিরোধী দল উপনির্বাচনে কেনো অংশ নেয়? আসলে জয় নয়, উপনির্বাচনে বিরোধী দলের মূল লক্ষ্য থাকে সরকারকে এক্সপোজ করা। সরকারের লক্ষ্য থাকে জেতা এবং এক্মপোজ না হওয়া। বিরোধী দল জামায়াত এক্সপোজ করায় ব্যর্থ হয়েছে। বিরোধী দলের কাজই হচ্ছে চিল্লাচিল্লি করে মাঠ গরম রাখা। চিমটি দিলে বলে আমাকে ঘুষি মারছে।
১৯৯১ থেকে ২০২১৩ সাল পর্যন্ত বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময়, উপনির্বাচনে আগের কয়েকদিন নির্বাচন কমিশনে যেতো নানা অভিযোগ নিয়ে। ( ২০১৩ সালের পর এটা বন্ধ হয়ে যায় নির্বাচন তামাশা হয়ে যাওয়ায়।) অভিযোগ সত্য না মিথ্যা তা পরের কথা। মূল উদ্দেশ্য থাকত মিডিয়ায় নিজেদের কথা তুলে ধরে, সরকারকে চাপে রাখা এবং হাইপ তৈরি করা। জামায়াত এবারের নির্বাচনে মাত্র একদিন অভিযোগ যায় ইসিতে। তাও ভোটের আগেরদিন।
১৯৯১ থেকে ২০২১৩ সাল পর্যন্ত বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময়, উপনির্বাচনে দলের নেতাদের একটি টিম ইসিতে আরেকটি দলীয় কার্যালয়ে রাখত। তারা সাংবাদিকদের নিয়ে থাকতেন। আর অভিযোগের পর অভিযোগ করে যেতেন। জামায়াত এর কিছুই করতে পারেনি। যা নির্বাচন নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতির প্রমাণ।
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সরকারি দল সংসদ নির্বাচনের জেতা আসন দুই বছরের মধ্যে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে হারায়নি।
১৯৯১ সালে ১১টি আসনে উপনির্বাচন হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়া ঢাকা-৫, ঢাকা-৯, চট্টগ্রাম-৮, ফেনী-৩ এবং বগুড়া-৭ আসনসহ ৫টি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। এরশাদ সাহেব রংপুর ১, ২,৩, ৫ এবং ৬ আসনসহ ৫টি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করা বাকশালের আবদুর রাজ্জাক শরিয়তপুর এবং মাদারীপুরে সাহেব দুটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। তাঁরা একটি করে আসন রেখে বাকিগুলো ছেড়ে দেন। আর মাদারীপুর-১ আসনের এমপি ইলিয়াস চৌধুরীর মৃত্যুতে নির্বাচনের পরপরই আসনটি শুন্য হয়। আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হওয়ায়, তার বরিশালের আসনেও উপনির্বাচন হয়েছিল একানব্বইয়ের শেষ দিকে। তার ছেলে নাসিম বিশ্বাস বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি তাদের জেতা আসন দখলে রাখে উপনির্বাচনে। আর বাকশাল আওয়ামী লীগে একীভূত হওয়ায়, মাদারীপুর-২ নৌকা নির্বাচন করে। জয়ী হয়। জিতেছিলেন জাসদ থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া শাজাহান খান।
১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের কেউ একাধিক আসনে জিততে পারেননি। ফলে তাদের জেতা আসনে বেশি একটা উপনির্বাচন হয়নি। শেখ হাসিনা সেবার ঢাকা-৭ এবং ১০ এবং গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচন করেছিলেন। ঢাকার দুটি আসনেই হেরে যান।
একানব্বইয়ের সংসদে আরও কিছু উপনির্বাচন হয়। এর মধ্যে কুখ্যাত ১৯৯৪ সালের মাগুরা। আওয়ামী লীগের এমপির মৃত্যুতে উপনির্বাচন হয়েছিল। জেতে বিএনপি। প্রচুর কারচুপির কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন চাঙ্গা হয়।
১৯৯৬ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসনে উপনির্বাচন হয়। খালেদা জিয়া ৫টি, এরশাদ ৫টি, শেখ হাসিনা ৩টি আসনে জয়ী হন। এছাড়াও আওয়ামী লীগের আবদুর রাজ্জাক, জিল্লুর রহমান, মো নাসিম, তোফায়েল আহমদ দুটি করে আসনে জয়ী হন। বিএনপির অলি আহমদ এবং জাতীয় পার্টির আনোয়ার হোসেন দুটি করে আসনে আসনে জেতেন।
তাদের ছাড়ার পর ১৭টি আসনে উপনির্বাচনে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তোফায়েল সাহেবের লোকজন মামলা করে ভোলা-২ আসনের উপনির্বাচন আটকে দেন। ফলে পরের পাঁচ বছর কার্যত তিনি দুইটি আসনের এমপি ছিলেন। আগের দিনে রাজনীতিতে একাধিক আসনে নির্বাচন ও জেতা ছিল, বড় নেতা হওয়ার প্রমাণ। তাই সব জাতীয় নেতা একাধিক আসনে প্রার্থী হতেন। এখন আর এটা নেই।
যাই হোক ১৯৯৬ সালের উপনির্বাচনে বিএনপি তাদের জেতা ৫টি আসনের তিনটিতে জিতে। অল্প ভোটে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেওয়া চট্টগ্রাম-১ আসনে জিতেন সেই সময়কার সরকারি দল আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ। সবচেয়ে কুখ্যাত উপনির্বাচন ছিল লক্ষীপুর-২ আসনের উপনির্বাচন। খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেওয়া আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন জাতীয় পার্টি থেকে আসা মওদুদ আহমদ। প্রচুর কারচুপির পর উনির্বাচনে যেতে আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে ব্যালট লুটের কারণে সারাদেশে পরিচিতি পান গডফাদার তাহের।
এরশাদের জেতা রংপুর-২ এবং রংপুর-৫ আসনেও জেতে আওয়ামী লীগ। বাকি সব আসনে সংসদ নির্বাচনে জয়ী দল জিতে। বিশাল ব্যবধানে জিতে। যেমন বাগেরহাট-১ আসনের উপনির্বাচনে শেখ হেলাল ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন মনে পড়ে। অথচ সংসদ নির্বাচনে খোদ শেখ হাসিনা এই আসনে ৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
ছিয়ানব্বইয়ের সপ্তম সংসদে সংসদে বিএনপির দুই এমপি হাসিবুর রহমান এবং আলাউদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হয়ে যান। বিরোধী দলের এমপি থেকে মন্ত্রী! ফ্লোর ক্রসিংয়ে তাদের এমপি পদ বাতিল হয়। দুজনেই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে উপনির্বাচনে মনোনয়ন পান। রাজশাহীতে আলাউদ্দিন জিতলেও সিরাজগঞ্জে হেরে যান, হাসিবুর রহমান।
সপ্তম সংসদে আরও কিছু উপনির্বাচন হয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত টাঙ্গাইলের আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের আসনটি। তিনি আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করার পাশাপাশি সংসদ থেকেও পদত্যাগ করেছিলেন। পরবর্তীতে উনার আসনে উপনির্বাচন হয়। সে নির্বাচনে তিনি নৌকার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। সেই নির্বাচনও ছিল আরেকটি কলুষিত উপনির্বাচন। পত্রিকার ছবি প্রকাশছিল কাদের সিদ্দিকীর পোলিং এজেন্টদেরকে গাছে বেঁধে উপনির্বাচন হচ্ছে।
২০০১ সালে খালেদা জিয়া ৫টি, শেখ হাসিনা ৪টি এবং বিএনপির সাইফুর রহমান দুটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। বিএনপি উপনির্বাচনে তাদের জেতা সবগুলো আসনে জয়ী হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার ছেড়ে দেওয়া বরগুনা-৩, নড়াইল-১, নড়াইল-২সহ তিনটি আসনেই হেরে যায়।
মজার ছিল টুঙ্গিপাড়া লাগোয়া নড়াইল-১ আসন। এই আসনে ৯১ এবং ৯৬ সালে এমপি ছিলেন আওয়ায়ী লীগের ধীরেন্দ্রনাথ। ২০০১ সালে শেখ হাসিনা নিজে নির্বাচন প্রার্থী হওয়ায় মনোনয়ন পাননি তিনি। এই ক্ষোভে বিএনপিতে যোগ দিয়ে প্রার্থী হন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নির্বাচন করেন। হেরে যান বড় ব্যবধানে।
শেখ হাসিনা শুধু গোপালগঞ্জ রাখেন, বাকি আসনগুলো ছেড়ে দেন। নড়াইল ১ আসন উপনির্বাচনে আবার প্রার্থী হন ধীরেন্দ্রনাথ। এবার তিনি আওয়ামী লীগকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী হিসেবে।
২০০১ সালে নড়াইল-২ আসনে স্বল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি আসনটি ছেড়ে দেওয়ার পর উপনির্বাচনে আবারো প্রার্থী হন বিএনপি জোটের শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী মুফতি শহীদুল ইসলাম। মুফতি শহীদুল উপ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ৯৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, যা এখন পর্যন্ত উপনির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোট। তবে এই উপনির্বাচন নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক কারচুপি হয়েছিল। নইলে গোপালগঞ্জের পাশের নড়াইলে নৌকার বিরুদ্ধে ৯৮ শতাংশ ভোট পাওয়া অসম্ভব। তো নির্বাচনটি নিশ্চিতভাবে কারচুপিপূর্ণ ছিল।
২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া তিনটি, এরশাদ তিনটি এবং শেখ হাসিনা দুটি আসনে জয়ী হন। খালেদা জিয়া বগুড়া-৬ এবং ৭ আসন ছেড়ে দিলে বিএনপি জয়ী হয় উপনির্বাচনে।
এরশাদ ছাড়েন রংপুর ৩ এবং কুড়িগ্রাম-২ আসন। শেখ হাসিনা ছাড়েন রংপুর- ৬ আসন। এ আসনের উপনির্বাচন আওয়ামী লীগ জিতে। কিন্তু এরশাদের ছেড়ে দেওয়া কুড়িগ্রামে জিতে সরকারি দলের নৌকা।
২০০৮ সাল থেকে ২০১৩ যে উপনির্বাচনগুলো হয়েছিল, তাতে একটি বদে সরকারি দল আওয়ামী লীগ সবগুলোতে জয়ী হয়েছিল। ২০১১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং হবিগঞ্জ আসনে উপনির্বাচন হয়। দুটি আসনেই আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন, তাদের মৃত্যুর কারণে আসনগুলো শূন্য হয়েছিল। হবিগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের দেওয়ান ফরিদ গাজীর মৃত্যুতে শূন্য আসনটিতে বিএনপির শেখ সুজাত জয়ী হয়েছিলেন। যা সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার সরকারি দল তাদের জেতা আসন উপনির্বাচনে হারিয়েছিল।
তবে অষ্টম সংসদে জামায়াতের আব্দুল্লাহ হিল কাফির
জেতা দিনাজপুর-১ আসনে উপনির্বাচন হয় ২০০৫ সালে। এতে জামায়াত ফের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অংশ হিসেবে। সেই নির্বাচনে জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনরঞ্জন শীল গোপাল। যাকে সমর্থন করেছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ প্রার্থী না দিয়ে তার পক্ষে নেমেছিল। ওই নির্বাচনে মনরঞ্জন শীল গোপাল জয়ী হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। ওই সময়ে জামায়াত সরকারের শরিক ছিল। এখানে বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ছিল। তবে সরকারি ও বিরোধী দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে শুধু মাত্র ২০১১ সালেই সরকারি দলের জেতা আসনে হারার নজির রয়েছে।
জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ায় ২০০৯ সালে কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে উপনির্বাচন হয়। কাস্টিং ভোট ব্যাপক কমলেও, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নর্বাচনে প্রাপ্ত তাদের ভোটের শতকরা হার ধরে রাখে উপনির্বাচনে। যেমনটা হয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ে।

টেলিগ্রাম ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ