দেশের অন্যতম সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ এখন মাদক, অস্ত্র, অপহরণ এবং মানবপাচারের আখড়া হিসেবে পরিচিত। পাহাড়, সমুদ্র, নদীপথ আর বৈচিত্র্যময় সীমান্ত এলাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কয়েকটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে আসছে এ ভয়ঙ্কর চোরাচালান চক্র। মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে কিছুটা সফল দাবী করলেও বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এই সিন্ডিকেটগুলো দিন দিন আরও প্রভাবশালী ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, টেকনাফের ৩০টি সীমান্ত পয়েন্টে রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক। রাত নামলেই প্রতিদিন কোন না কোন সীমান্ত দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে দেশ থেকে নৌকায় মিয়ানমারে পাচার করা হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে আনা হয় মাছ, কাকড়াসহ নানা ধরনের মিয়ানমারের পণ্য। আর এসব পণ্যের আড়ালে আনা হচ্ছে ইয়াবা, আইস ও বিভিন্ন ধরেনের মরণাস্ত্র। এসব মালামাল বা মাদক আনা নেওয়ার পেছনে জড়িত রয়েছে অধিকাংশই চিহ্নিত অস্ত্রধারী মাদক কারবারী, রোহিঙ্গা, রাজনৈতিক ব্যাক্তি ও জনপ্রতিনিধি। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও তাদের সোর্সও জড়িত রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এসব সিন্ডিকেটের ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পায় না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যাক্তি জানান, টেকনাফের ৩০টি সীমান্তের কোন না কোন সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন দেশে প্রবেশ করছে মরণঘাতি ইয়াবার চালান। যারা এসব মাদকের চালান আনে, তারা শুধু মাদক নয়, ভারী অস্ত্রও আনেন। আর এসব মাদকের চালান খালাস করতে আইনশৃংখলা বাহিনীর নাকের ডগায় এসব ভারী অস্ত্র ব্যাবহার করছে প্রতিদিন। প্রতিবাদ করলে গুম বা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখায় এসব মাদক ব্যাবসায়ীরা।
একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে উপরমহল থেকে চাপ আসে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন পুরো টেকনাফ সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাবে। প্রশাসনের কয়েকজন সোর্স জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের অদৃশ্য সহযোগীতায় প্রতিদিন মিয়ানমার থেকে প্রবেশ করছে লাখ লাখ পিস ইয়াবা। তারা কঠোর হলে বা চাইলে একটি ইয়াবার দানাও মিয়ানমার থেকে দেশে প্রবেশ করবে না।
সম্প্রতি টেকনাফের কয়েকজন মাদক মাফিয়াদের বিরুদ্ধে একটি তালিকাও তৈরী করেছে প্রশাসন। প্রশাসনের তালিকার সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে বেরিয়ে এসেছে বর্তমানে কাদের নিয়ন্ত্রণে মাদক কারবার। অনুসন্ধানের ১ম পর্বে কয়েকজন মাদক ব্যাবসায়ীর সিন্ডিকেট, অস্ত্রের ব্যাবহার ও সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে।
জানা গেছে, শাহপরীর দ্বীপ এলাকা একসময় ছিল জেলেদের শান্তিপূর্ণ বসতি। আজ তা রূপ নিয়েছে মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালানের ভয়ংকর দুর্গে। পাহাড়, নাফ নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত এই দ্বীপে গড়ে উঠেছে একাধিক মাদকের করিডোর। যার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এখানকারই কিছু বর্তমান ও সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা।
তার মধ্যে অন্যতম সাবরাং ইউনিয়ন শাহপরীর দ্বীপ ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মান্নান। স্থানীয়রা তাকে শুধু মেম্বার নয়, ইয়াবা সম্রাট হিসেবেই চেনেন। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে শাহপরীর দ্বীপের মাদক সম্রাজ্য। মাদকের টকয়েক কোটি টাকার সম্পদ, জমি ও বাড়ি করেছেন বলে জানায় স্থানীয় সূত্র।
একইভাবে ৯নং ওয়ার্ডের সাবেক ফজল হক মেম্বার প্রাক্তন হলেও তার মাদকের প্রভাব এখনো অটুট। স্থানীয় রাজনীতির ছত্রছায়ায় থেকে গড়ে তুলেছেন মাদকের নিজস্ব নেটওয়ার্ক। মাদকের টাকায় ফিশিং ট্রলার, জমি, বাড়িসহ অনেক সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের তালিকার বাইরের লোক হিসেবেই মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
এছাড়াও ৮নং ওয়ার্ডের দেলোয়ার ডাকাত শুধু নামেই ডাকাত নয়, কাজেও তাই। এলাকাবাসীর ভাষায়, দেলোয়ারের নৌকা মানেই মিয়ানমার থেকে মাদক আসছে। তার নামে রয়েছে একাধিক মামলা। তার শক্তিশালী অস্ত্রধারী একটি বাহিনী রয়েছে বলে জানা গেছে। সে রাতে নৌপথ ব্যবহার করে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান আনে, দিনে স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে দেয় বলে জানা গেছে।
টেকনাফ মুন্ডার ডেইল ও আলীর ডেইল সীমান্তের মাদক নিয়ন্ত্রণ করেন সাবরাং ১নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন দানু ও বিএনপি নেতা বাইট্টা মার্কিন। দানুর বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। দুই কোটি টাকা খরচ করে করেছেন রাজকীয় বাড়ি, কিনেছেন ৫ একরের মাছের প্রজেক্ট,৭ একর লবণের মাঠ, ১টি পুকুর, ফিশিং ট্রালার দুইটি, সুপারি বাগান দুইটি। এছাড়াও নামে বেনামে ১০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তার। স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর সাবেক এমপি বদির বাগিনার নিপু গা ঢাকা দিলে তার সব ধরনের বৈধ-অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন এই সাবেক ইউপি সদস্য দানু। এবং বাইট্টা মার্কিনের রয়েছে মাদকের বিশাল সিন্ডিকেট। মাদকের টাকায় কক্সবাজার শহরে কিনেছেন ফ্ল্যাট, নিজ এলাকায় করেছেন বাড়ি, মেরিন ড্রাইভ সহ বিভিন্ন জায়গায় নামে বেনামে কিনেছেন কয়েক কোটি টাকার জমি।
টেকনাফের নাইট্টং পাড়া সীমান্তজুড়ে গড়ে উঠেছে এক সুসংগঠিত মাদক চক্র, যার মূল নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন এলাকারই সাবেক জনপ্রতিনিধিরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই রুট নিয়ন্ত্রণ করেন গুরা মিয়া, সাবেক কমিশনার শাহআলম, সাবেক কমিশনার দুলু, মোঃ ইকবাল ও সরওয়ার।
সাবরাং ৩ নং ওয়ার্ডের কচুবনিয়া এলাকার মোজাফফর মিয়ার ছেলে গুরা মিয়ার রয়েছে একাধিক মামলা। সে মানব পাচারের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করেন মাদক ব্যাবসা। এলাকায় সবাই তাকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে চিনে। তার ভারী আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছেও বলে জানিয়ে একটি সূত্র। মাদক ও মানব পাচারের মাধ্যমে কোটি টাকা খরচ করে করেছেন দুইতলা বাড়ি, কচুবনিয়া বাজারের সাথে কিনেছেন সুপারি বাগান সহ ১ কানি জমি, কিনেছেন ৩ একরের মাছের প্রজেক্ট, রয়েছে মুরগীর ফার্ম, ১টি পুকুর, ২ একর লবণের মাঠসহ নামে বেনামে প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে জানা যায়। তাদের হয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করে একটি সিন্ডিকেট। তারা ফিশিং বোট ও ডিঙ্গি জাল ব্যবহার করে সীমান্তপথে মাদকের চালান আনা-নেওয়ার কাজ পরিচালনা করেন। এছাড়াও মিয়ানমারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য পাঠিয়ে বিনিময়ে ইয়াবা ও আইসের চালান আনেন তারা।
টেকনাফ সদর ইউনিয়ের তুলাতলী সীমান্তে মাদকের সব ধরনের মাদক ও মানবপাচার নিয়ন্ত্রণ করেন কাদের ও আব্দুল আজিজ। কাদেরের বিরুদ্ধে মানবপাচার সহ কয়েকটি মামলা রয়েছে। মাদক ও মানবপাচারের অবৈধ টাকায় মেরিন ড্রাইভে ক্রয় করেছে জমি। করেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। চোরা কারবার ও মানবপাচারের কাজে ব্যাবহার করেন দামী মোটরসাইকেল। এবং আব্দুল আজিজের মেরিন ড্রাইভে প্রায় কয়েক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। কোটি টাকা খরচ করে করেছে আলীশান বাড়ি। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক হমামলা।
টেকনাফ বাহারছড়া ঘাট, লম্বরী ঘাট, মহেশখালীয়া পাড়া ঘাট ও খুরের মুখ নৌ ঘাট পর্যন্ত মাদকের নিয়ন্ত্রণ করেন বাহারছড়া এলাকার জাফর প্রকাশ বেজি জাফর, জসিম, মাহমুদুল হক, আজিজুল হক প্রকাশ আরজু, গোদার বিল এলাকার মোঃ কাশেম ও তার ভাই ছৈয়দ কাশেম, সেবর আলম। তাদের প্রতিজনের অবৈধ অস্ত্র রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসনের একটি সূত্র। আর এদের হয়ে কাজ করে প্রায় ৫০ জনের একটি অস্ত্রধারী সিন্ডিকেট। তারা এসব ভারী অস্ত্র ব্যাবহার করে মাদক কারবার ও মাদক ছিনতাইয়ের মত কর্মকান্ড করে বেড়ায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সরকার পতনের পর সাবেক এমপি বদির আত্মীয়ের একটি রেস্টুরেন্ট দখল করে সেখানে নিয়মিত মাদক বেচাকেনার হাট বসান বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
টেকনাফের জিরো পয়েন্ট ও সাবরাং বাজারকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসায় সক্রিয় রয়েছে আরেকটি শক্তিশালী চক্র। তাদের মধ্যে রয়েছে মোঃ ইসমাইল, একরাম এবং শমসু মেম্বার। এবং কাটাবনিয়া এলাকায় , উমর, গুরা মিয়া, ফারুক ও রিদুয়ান।
শমসু মেম্বারের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। আর তার নামে ও বেনামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। একই চক্রের আরেক সদস্য টেকনাফ সদর ইউনিয়ন ৮ নং ওয়ার্ডের মোঃ একরামের বিরুদ্ধে রয়েছে ১০টি মামলা। অবৈধ অস্ত্রধারী হিসেবেই এলাকায় পরিচিত। মাদকের ব্যবসায় চার তলা ফাউন্ডেশনে করেছেন এক তলা বিশিষ্ট রাজকীয় বাড়ি। তার রয়েছে ১০ একর লবণের মাঠ, ১৫টি ট্রাক, মাছের প্রজেক্ট ১০ একর, এছাড়াও নামে বেনামে প্রায় ৩০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চক্র দিনের আলোয় প্রশাসনের নাকের ডগায় মাদকের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।
টেকনাফের বাসিন্দারা অস্ত্র ও ইয়াবার অঘোষিত গডফাদার হিসেবে চেনেন কোস্ট গার্ডের সোর্স মিজানকে। টেকনাফের কেরুনতলী সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন মিজান। যিনি শুধু মাদক নয়, মিয়ানমারে নিত্য পণ্য পাঠিয়ে দেশে নিয়ে আসেন মাদক ও আধুনিক অস্ত্র। একেএ-৪৭, জি থ্রি রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল সহ নানান ধরনের অস্ত্র এনে সরবরাহ করেন দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও মাদক সম্রাটদের কাছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, কোস্ট গার্ডের অভিযানে নেতৃত্বে ১ম সারিতে থাকেন তিনি এবং কোস্ট গার্ডের অভিযানে জব্দ হওয়া ইয়াবা তালিকায় কম দেখিয়ে তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বিক্রিও করেন মিজান। মাদক বিক্রি ও অস্ত্র পাচারের টাকায় মিজান গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল বাড়ি, ফিশিং ট্রলার,জমি ও গাড়ি। স্থানীয়রা বলেন,
কোস্ট গার্ডের নিয়ন্ত্রণ মিজানের হাতে, তাকেই সবাই কোস্ট গার্ডের সদস্য হিসেবে চেনেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার পরেও বীরদর্পে কিভাবে কোস্ট গার্ডের সাথে ঘুরে বেড়ায় বলেও অভিযোগ জানিয়েছেন খোদ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
এছাড়াও মাদকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন টেকনাফ সদরের জালিয়াপাড়া পাড়া, রুবেল, আবিয়া, খোকন, মাহমুদুল হক, দক্ষিণ জালিয়া পাড়ার আজাদ, নাইম, নুরুল বশর, মোঃ জুবাইর, মোঃ ইমান, দক্ষিণ জালিয়া পাড়ার মোঃ সালমান ও মোস্তাক হাঙ্গার ডেইল, তারেক, আবদুর রহমান, আফসার, আবদুর রহমান, জয়নাল আবেদীন, নাজির পাড়া, এনামের ভাতিজা তারেক, রফিক, তোফায়েল, ছমদ, মৌলভীপাড়ার আবদুর রহমান,
কোনকার পাড়ার বিচ্চু জাফর।
টেকনাফের হ্নীলা রঙ্গিখালী জামাল মেম্বারের ছেলে শাহ আজম সরকার একাই শাসন করে রঙ্গিখালী। তার মাদকের টাকার এতই প্রভাব যে স্থানীয়রা তাকে রঙ্গিখালীর সরকার নামেই বেশি চিনে। মাদকের টাকায় ২০ একর জমির উপর করেছে একটি টিনশেড বাড়ি। মুরগীর ফার্ম ৪টি, গরুর ফার্ম ১টি, প্রাইভেট গাড়ি ২টি, ড্রাম্প ট্রাক ২টি ও স্বর্ণলংকারসহ প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে ১৫ জনের একটি অস্ত্রধারী একটি সিন্ডিকেটও রয়েছে তার। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে অপহরণ ও ডাকাতি করে বলেও অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। লেদার লাল মিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে মাদক ব্যাবসা করে হয়ে গেছেন টাকার কুমির। বনে গেছেন অঢেল সম্পদ ও অর্ধশত কোটি টাকার মালিক। অজ্ঞাত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। হ্নীলা ৮নং ওয়ার্ডের নুরুল হুদা মেম্বার ইয়াবা বেচে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। জ্ঞাত বহির্ভুত সম্পদ অর্জনপূর্বক ভোগ দখলের অপরাধে নুরুল হুদার বিরুদ্ধে মামলাও করে দুদক।
এছাড়াও উত্তরের নাটিক্কার কোনা, উনচিপ্রাং ব্রিজ, কানজর পাড়া, ঝিমংখালী, খারাংখালী, মৌলভীবাজার, ওয়াব্রাং, হ্নীলা ফুলের ডেইল, চৌধুরী পাড়া, জালিয়া পাড়া, লেদা, রঙ্গীখালী ও জাদি মোড়া সীমান্তজুড়ে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর মাদক সাম্রাজ্য। এসব পয়েন্টের প্রায় প্রতিটিই এখন মাদক পাচারের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। এই সীমান্ত পথগুলো দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক দেশে প্রবেশ করে। আর এই কারবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মাফিয়া গোষ্ঠী তাদের মধ্যে রয়েছে হ্নীলা পূর্ব সিকদার পাড়ার বিএনপি নেতা আতর সাইফুল, হ্নীলা ২ নং ওয়ার্ডের বেলাল মেম্বার, কোনার পাড়ার মোঃ ইদ্রিসের ছেলে রমিজ উদ্দিন, ওয়াব্রাংয়ের মোস্তাক-সেলিম-নওশেদ, ঝিমংখালীর মামুন, কানজর পাড়ার জামাল, কানজর পাড়া বাদশা মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেন, মৌলভীবাজারের বেলাল মেম্বার ও চাম বাদাশার ছেলে সাদ্দাম, নুরুল হুদা মেম্বার, হোয়াইক্কং নয়া বাজারের শমসু উদ্দিন, উনচিপ্রাং বাজারের খেলনার দোকানের আনোয়ার।এরা সবাই চিহ্নিত মাদক চক্রের শীর্ষে রয়েছেন।
দমদমিয়া সীমান্তের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন আইয়ুব নামের এক ব্যক্তি, যিনি স্থানীয়দের কাছে মাদকের গডফাদার হিসেবে পরিচিত। চৌধুরী পাড়া, রঙ্গিখালী ও জালিয়া পাড়ার মিজানের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। এইসব চক্র শুধু মাদক পাচারই করছে না, বরং মিয়ানমারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাঠিয়ে বিনিময়ে মাদক এনে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে। মাদকের এসব সিন্ডিকেটের পেছনে রয়েছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য। এরা মাদকের টাকায় গাড়ি, বাড়ি, জমি কিনে সমাজে প্রভাবশালী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রশাসনের নাকের ডগায় চলা এই ব্যবসা বন্ধে এখনও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই। বরং অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সহায়তায় এই চক্র আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
এছাড়াও মাদকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন টেকনাফ সদরের জালিয়াপাড়া পাড়া, রুবেল, আবিয়া, খোকন, মাহমুদুল হক, দক্ষিণ জালিয়া পাড়ার আজাদ, নাইম, নুরুল বশর, মোঃ জুবাইর, মোঃ ইমান, দক্ষিণ জালিয়া পাড়ার মোঃ সালমান ও মোস্তাক হাঙ্গার ডেইল, তারেক, আবদুর রহমান, আফসার, আবদুর রহমান, জয়নাল আবেদীন, নাজির পাড়া, এনামের ভাতিজা তারেক, রফিক, তোফায়েল, ছমদ, মৌলভীপাড়ার আবদুর রহমান,
কোনকার পাড়ার বিচ্চু জাফর ও আত্মসমর্পণকারী ইয়াবার ডন সাবরাং শাহপরীরদ্বীপের যুবলীগ নেতা ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রেজাউল করিম রেজু। তার নামে বেনামে রয়েছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ। টাকার বিনিময়ে হাতিয়ে নিয়েছেন ইউপি সদস্যের পদ।
স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক সদস্য জানান, তারা অনেক সময় এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গেলেও ভেতর থেকে তথ্য পাচার হয়ে যায়। ফলে অভিযানে গেলেও তেমন ফল আসে না। এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, সব ডিপার্টমেন্ট জানে মাদক কারবারে কারা কারা জড়িত, কিন্তু তাদের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ছত্রছায়া, প্রভাবশালীদের আশ্রয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কথা হয় বেশ কয়েকজনের সাথে, কয়েকজন মাদক সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন, কয়েকজন জড়িয়ে পড়েন বিতর্কে। এছাড়াও কয়েকজন বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির শুরু করেন। আবার অনেকের নাম্বার না পাওয়ায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন বলেন, পুরাতন যারা মাদকের গডফাদার আছে তাদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। নতুন ও পুরাতন মাদকের গডফাদারদের মিলিয়ে প্রতিজনের জন্য আলাদা আলাদা প্রোফাইল তৈরী করা হচ্ছে। যাতে করে তাদের গতিবিধি নজরদারির ভিতরে রাখা যায়।
টেকনাফ সীমান্তে এত নিরাপত্তা চৌকি থাকার পরেও কিভাবে মাদক প্রবেশ করে জানতে টেকনাফ ২ বিজির অধিনায়ক আশিকুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

শাহেদ ফেরদৌস হিরু
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ । ১০:৫৬ অপরাহ্ণ