মিয়ানমারে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে অভ্যন্তরীণ সংঘাত। একদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, অন্যদিকে আরাকান আর্মি (এএ) আর মাঝখানে রোহিঙ্গা সংগঠন আরসা (ARSA)। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে আরাকান রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। গুলিবিনিময়ের এই উত্তাপে অস্থির বাংলাদেশের সীমান্তের মানুষও।
প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শোনা যাচ্ছে গোলাগুলির শব্দ। কখনো সীমান্তের ওপার থেকে ছুটে আসছে মর্টার শেল, কখনো ভেসে আসছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। কক্সবাজারের নাইক্ষ্যংছড়ি ও টেকনাফ সীমান্তে এখন আতঙ্ক যেন নিত্যসঙ্গী। স্থানীয়দের ভাষায়, “আমরা যুদ্ধ করছি না, কিন্তু যুদ্ধ আমাদের ঘরে চলে এসেছে।”
সীমান্তে ভয় আর উদ্বেগ
নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম, তুমব্রু, বান্দরবানের রেজু ও কক্সবাজারের উনচিপ্রাং এলাকায় মাঝে মধ্যেই মিলছে গুলির শব্দ। অনেক সময় গুলি বা মর্টার শেল এসে পড়ছে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে। এমন ঘটনায় একাধিকবার হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।
সীমান্তবাসী জানাচ্ছেন, সন্ধ্যা নামলেই ভর করে ভয়। রাতের নীরবতা ভেদ করে শোনা যায় গুলির আওয়াজ। শিশু, নারী, বৃদ্ধ সবাই আতঙ্কে সময় পার করছেন।
ঘুমধুমের একজন স্থানীয় শিক্ষক বলেন, “আমরা যেন মিয়ানমারের যুদ্ধের ড্যামেজ কন্ট্রোল সাইডে আছি। তারা যুদ্ধ করবে, আর আমরা মাথা নিচু করে শুনব কখন কী এসে পড়ে!”
বিজিবির সর্বোচ্চ সতর্কতা
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তজুড়ে নজরদারি জোরদার করেছে। বিজিবি জানায়, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রস্তুত এবং সীমান্তে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তবে সীমান্তের মানুষদের মতে, শুধু টহল নয় এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক উদ্যোগও জরুরি হয়ে পড়েছে, যেন মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর না পড়ে। তবে বিজিবি বলছে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে তারা।
দেশের সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিয়ানমারের এই যুদ্ধ আর বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে চলছে তীব্র আলোচনা। অনেকে ক্ষোভ আর রসিকতার মিশেলে লিখছেন “মাথাব্যথা মিয়ানমারের, প্যারাসিটামল খাচ্ছে বাংলাদেশ!”।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অস্থিরতা
মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘর্ষ বেড়েই চলেছে। সেনা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী ও বিদ্রোহী সংগঠনগুলো অস্ত্র হাতে নিয়েছে। সামরিক বাহিনীর দমন অভিযান এবং বিদ্রোহীদের পাল্টা আক্রমণে এখন দেশটি কার্যত গৃহযুদ্ধে জর্জরিত।
আরাকান রাজ্যে এই সংঘাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এখানকার আরাকান আর্মি এখন প্রায় স্বাধীনভাবে কয়েকটি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় এখানকার গোলার আওয়াজ আর আতঙ্কের ছায়া বাংলাদেশের সীমান্তেও ছড়িয়ে পড়ছে।
এদিকে সীমান্ত এলাকার মানুষ এখন শান্তি চায়। তারা চায়, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর না ছড়াক সীমান্তে। স্থানীয়দের একটাই আর্তি“আমরা যুদ্ধ চাই না, নিরাপত্তা চাই।”
এক প্রবীণ সীমান্তবাসী মজার ছলে বললেন, “যুদ্ধ করছে ওরা, কিন্তু আমাদের ঘুম হারাম। এখন তো মনে হয়, মিয়ানমারের মাথাব্যথার প্রেসক্রিপশনও আমাদের ঘাড়ে পড়ছে!”

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৫ । ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ