পাহাড়ি ছড়ায় প্রতিমাসে কোটি টাকার বালু কারবার, প্রশাসনের নীরবতায় হুমকিতে বন ও জীববৈচিত্র্য

শাহেদ ফেরদৌস হিরু
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ । ১১:০০ অপরাহ্ণ

কক্সবাজারের চকরিয়া ও লামা সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া, বিশেষ করে পাগলির ছড়ার শেষ প্রান্তের পূর্ব পাশ, রংমহলের সোজা পূর্ব দিক, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড ও বগাছড়ি পাহাড়ের ছড়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে ব্যাপক বালু উত্তোলন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বছরের পর বছর একটি প্রভাবশালী চক্র সরকারি নিয়ম-নীতি অমান্য করে এসব এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু তুলছে এবং প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে। প্রতিমাসের হিসেবে অবৈধ বালু বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় কোটি কোটি টাকায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু উত্তোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চকরিয়ার ডুলাহাজার রংমহল এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ আহমদের ছেলে জয়নাল আবেদীন ভুট্টো। তার নেতৃত্বে একটি সংগঠিত চক্র পাহাড়ি ছড়ার বিভিন্ন স্থানে শক্তিশালী মেশিন বসিয়ে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বালু তুলে নিয়ে যাচ্ছে। পরে এসব বালু ট্রাক ও ডাম্পার যোগে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। কারণ এই চক্রটির রয়েছে শক্তিশালী অবস্থান, আর তাদের পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মহলের আশীর্বাদ।

চকরিয়া উপজেলা প্রশাসন ও লামা উপজেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা নিয়মিত মাসোহারা গ্রহণ করে এই অবৈধ কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, প্রশাসন চাইলে একদিনেই এসব অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু অজানা কারণে তারা দেখেও দেখছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় নেতা বলেন, প্রশাসন মাসে মাসে টাকা পায়। তাই তারা অভিযান চালায় না। যদি কখনো চালায়ও, সেটা শুধু দেখানোর জন্য। এরপর আবার আগের মতো সব চলতে থাকে।

পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়ি ছড়া ও নদীখাল থেকে বালু উত্তোলন করলে তিন ধরনের বড় ক্ষতি হয়—
পাহাড় ধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি, যা বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও রাস্তাঘাটকে বিপন্ন করে। জলধারার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত, ফলে শুকিয়ে যায় ছড়া, কমে যায় মিঠাপানির মজুত। বনাঞ্চল ও প্রাণবৈচিত্র্যের ধ্বংস, কারণ ছড়া ও পাহাড়ের মাটি সরে গিয়ে প্রাণীর আবাসস্থল ভেঙে পড়ে।

এক পরিবেশ সংগঠনের নেতা বলেন, এভাবে ছড়ার পেট কেটে বালু তুললে পুরো এলাকার প্রাকৃতিক জলাধার শুকিয়ে যাবে। পাহাড় অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়বে পুরো এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী জানান, ভারী যানবাহনের চলাচলে প্রতিদিন গ্রামের সড়কগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধুলাবালিতে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছেন আশপাশের গ্রামের মানুষ। বালুবাহী ট্রাকের গতির কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।

এক বৃদ্ধ কৃষক বলেন, ছড়ার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। আগে এই পানিতে সেচ নিতাম। এখন মাটি বসে যাচ্ছে, জমিও নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকি আসে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী স্রোতধারা, পাহাড় ও বনাঞ্চল থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া বালু-মাটি উত্তোলন, পরিবহন ও মজুত নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১০ অনুযায়ী অনুমতিবিহীন বালু উত্তোলনের শাস্তি হিসেবে রয়েছে বড় অঙ্কের জরিমানা ও কারাদণ্ড। তবুও প্রশাসনিক নীরবতা ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় আইনকে উপেক্ষা করেই চলছে বছরের পর বছর বালু কারবার।

স্থানীয়দের বলেন, এই কার্যক্রম এখনই বন্ধ না করলে পুরো এলাকা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই পরিবেশগতভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।

অভিযোগের ব্যাপারে জয়নাল আবেদীন ভুট্টো প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে সব স্বীকার করে বলেন, চকরিয়া উপজেলার মধ্যে বালু তোলা হচ্ছে না। যা তোলা হচ্ছে সব লামা হিল এলাকার মধ্যে। ডুলাহাজারায় শুধু বালু স্টক করে সাপ্লাই করা হয়। এছাড়া তিনি শুধু একা নয় প্রশাসন ও সবাইকে ম্যানেজ ম্যানেজ করে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

লামা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুবায়েত আহমেদ বলেন, আমরা কিছুদিন আগেও অভিযান চালিয়ে একজনকে আটক করেছি এবং বালু জব্দ করেছি। প্রয়োজনে আবারো অভিযান পরিচালনা করব। এছাড়া আমাদের অফিসের কেউ মাসোহারা নেয় না। আমরা অভিযান পরিচালনা করতে গেলে তারা আগেই খবর পেয়ে গাড়ি বন্ধ করে দিয়ে সতর্ক হয়ে যায়। তবে শীঘ্রই জড়িত মূলহোতাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা দায়ের করবে বলে আশা করছি।

চকরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুপায়ন দেব বলেন, কয়েকদিন আগেও একটি ট্রাক সহ বালুর স্তুপ জব্দ করে নিলামে দিয়েছি। তবে আবারো শোনা যাচ্ছে তারা লামা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে বালু এনে ডুলহাজারায় জমা করতেছে। শীঘ্রই অভিযান চালানো হবে বলে জানান তিনি।

স্বত্ব ২০২৪-২০২৫ টেলিগ্রাম নিউজ | সম্পাদক : জসিম উদ্দিন

প্রিন্ট করুন