একবছরে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে বন্যপ্রাণীর পরিবারে এসেছে শতাধিক নতুন অতিথি

টেলিগ্রাম ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৫:১৫ অপরাহ্ণ

একবছরে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে বন্যপ্রাণীর পরিবারে এসেছে শতাধিক নতুন অতিথি

মাতৃত্বকালীন সময়ে কোলাহল মুখর পরিবেশ এড়িয়ে নিবিড় পরিচর্যায় কোয়ারান্টাইনে রেখে সেবা দেয়ার

সুফল হিসেবে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের প্রাণীকুলে বেড়েছে ব্যাপক প্রজনন সক্ষমতা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বারোমাসে সাফারি পার্কের শতাধিক প্রাণীর সংসারে চমকে উঠার মতো বংশবিস্তার ঘটেছে। এরইমধ্যে পার্কের অন্যতম আকর্ষণ জ্রেবা জলহস্তী ও নীলগাই পরিবারে এসেছে নতুন শাবক।

 

একদিকে অবকাঠামোগত উন্নয়নে অনিন্দ্য সুন্দর পরিবেশে বদলে যাচ্ছে সাফারি পার্কের পর্যটন স্পটসমুহ। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের নিবিড় তদারকিতে কোলাহলমুক্ত পরিবেশে রাখা প্রাণীকুলে এসেছে একের পর এক নতুন অতিথি। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তেমন রোগবালাই না থাকায় পার্কের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর সংসারে সুস্থভাবে শতাধিক নতুন অথিতি (শাবক) জন্ম নিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন পার্কের রেঞ্জ অফিসার মোঃ মনজুরুল আলম।

 

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (রেঞ্জ অফিসার) মোঃ মনজুরুল আলম বলেন, বিগত বছরের

জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সাফারি পার্কের বিভিন্ন অবকাঠামোত উন্নয়ন কাজ এখনো চলমান রয়েছে। এ অবস্থায় সাফারি পার্কের নির্ধারিত বেস্টনীর প্রাণী ছাড়া সন্তানসম্ভবা বেশিরভাগ প্রাণীকে মাতৃত্বকালীন সময়ে কোলাহলমুক্ত পরিবেশ এড়িয়ে নিবিড় পরিচর্যায় কোয়ারান্টাইনে রাখা হয়। ফলে এই প্রচেষ্টার সুফল হিসেবে একবছরে সাফারি পার্কের প্রাণীকুলে এসেছে একের পর নতুন অতিথি।

 

জন্ম নেয়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে চার গয়াল শাবক। আগে থেকে আছে ২২টি গয়াল। নিরীহ তৃণভোজী প্রাণী গয়ালের প্রধান খাবার ঘাস। গয়াল আট মাসে প্রজননে সক্ষম। পার্কে আগে থেকে নীলগাই আছে দুটি। এবছর জন্ম দিয়েছে একটি পুরুষ শাবক। বয়স দুইমাস অতিক্রম করেছে। একইভাবে সাফারি পার্কে আগে থেকে জেব্রা আছে ৬টি। নতুন জন্ম হয়েছে দুটি। এখন জেব্রা পরিবারে সদস্য সংখ্যা দাড়িয়েছে আটে। এই প্রাণীকে দিনে একবেলা ভুষি ও দু্বেলা সবজি খেতে দিতে হয়। জলহস্তী আছে ১০টি। এবছর জন্ম দিয়েছে একটি শাবক। তিনমাস বয়সী শাবকটি এখন মায়ের সঙ্গে বেস্টনীতে ঘুরেফিরে বেড়ে উঠছে। তৃণভোজী প্রাণী জলহস্তির খাদ্য হিসেবে দিতে হয় ঘাস ও সবজি।

সাফারি পার্কের ৫৫ হেক্টর জমির বিশাল বেস্টনীতে আগে থেকে আছে তিনটি ওয়াইল্ডবিস্ট। তৎমধ্যে একটি স্ত্রী লিঙ্গের। এবছর তাদের সংসারে এসেছে দুটি শাবক। পার্কের বেস্টনীতে আগে থেকে আছে ৪৩টি চিত্রা হরিণ ও ৬টি মায়া হরিণ। এবছর নতুন এসেছে ৬টি চিত্রা হরিণ শাবক। ইতোমধ্যে এসব হরিণ শাবকের বয়স চারমাস পেরিয়েছে। পাশাপাশি বন মোরগ, ময়ুর, কালিমপাখী এবছরও ব্যাপক প্রজনন সক্ষমতা দেখিয়েছে।

 

সাফারি পার্কের রেঞ্জ অফিসার মনজুরুল আলম বলেন, ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে এবছর সুদুর আফ্রিকা থেক কার্গো বিমানে করে আনা হয়েছে তিনটি বাঘ। এই তিনটি বাঘের বয়স এখন ১৫ থেকে ১৮ মাস। টানা ২১ দিন নিবিড় পরিচর্যায় কোয়ারান্টাইনে পর্যবেক্ষণে রাখার পর ইতোমধ্যে বাঘগুলোকে বেস্টনীতে অবমুক্ত করা হয়েছে।

পার্কে আগে থেকে চারটি বাঘ রয়েছে, যার মধ্যে দুটি পুরুষ ও দুটি নারী বাঘ। নতুন করে সংগ্রহ করা তিনটির মধ্যে রয়েছে দুটি নারী ও একটি পুরুষ বাঘ। এখন ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে মোট বাঘের সংখ্যা দাঁড়াল সাতটি।

এছাড়াও পার্কের বেস্টনীতে মিঠাপানির কুমির আছে ১৯টি ও নোনা পানির কুমির আছে ১১টি। কুমির গুলোকে সপ্তাহে একবার খাবার দেওয়া হয়। ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে আগে থেকে রয়েছে তিনটি সিংহ, প্রশিক্ষতি একাধিক হাতি, ভাল্লুক, বিপুল পরিমাণ বানর, অজগর সাপ, লামচিতা, শকুন, ধনেশ, বন গরু, কচ্ছপ, পাখির মধ্যে শকুন, রাজ ধনেশ, ইগল, সাদা বক, রঙ্গিলা বক, সারস, কাস্তে চরা, মথুরা, নিশিবক, কানিবকসহ নানা ধরনের দেশি-বিদেশি প্রাণী রয়েছে। এসবের মধ্যে অনেক প্রজাতির প্রাণী বর্তমানে বাংলাদেশের বনাঞ্চল থেকে বিপন্ন বা বিলুপ্তির পথে রয়েছে।

 

সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি হাসপাতালের সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাতৃত্বকালীন সময়ে আমরা সন্তানসম্ভবা প্রাণীগুলোকে প্রতিবছর নিবিড় পরিচর্যা রেখে দেখভাল করি। চেষ্টা করি কোলাহলমুক্ত পরিবেশ থেকে তাদেরকে সরিয়ে নিয়ে নীরব এরিয়ায় রাখতে। এরই ফলশ্রুতিতে পার্কের বেশিরভাগ প্রাণী এবছর ভালো বংশবিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

 

ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, প্রজনন মৌসুমে জন্ম নেয়া বেশিরভাগ প্রাণীকে পার্কের ভেটেরিনারি হাসপাতালের চিকিৎসক সহকর্মীরা নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে তুলছেন। সেইজন্য পার্কের ভেটেরিনারী বিভাগের সবাই কাজ করে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, জন্ম নেওয়া প্রাণী যাতে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে, সেইজন্য পার্কের ভেটেরিনারী বিভাগের চিকিৎসক কর্মকর্তা সবাইকে যত্নসহকারে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছি।

 

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দয্যের লীলাভূমি কক্সবাজার জেলার প্রবেশদ্বার চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নে ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই পার্ক। পার্কটি মূলত বিলুপ্তপ্রায় এবং বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রজননের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়।

অবশ্য তাঁর আগে ১৯৮০-৮১ সালে এটি একটি হরিণ প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে শুরু হয় এবং পরে এটি দেশের প্রথম সাফারি পার্ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, যা পরবর্তীতে ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক নামেও পরিচিত হয়।

এরপর থেকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও বংশবৃদ্ধিসহ মানুষের চিত্ত বিনোদন, গবেষণা ইত্যাদি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সেসময় সরকার কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নে স্থাপন করেন দেশের প্রথম “এই সাফারি পার্ক”।

 

সেই থেকে সাফারি পার্কে ভ্রমনে আসা দেশ-বিদেশী পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। এখানে রয়েছে হাজার প্রজাতির দেশি-বিদেশী পশু-পাখি। সাফারি পার্ক ও চিড়িয়াখানার মধ্যে পার্থক্য হলো-সাফারী পার্কে পশুপাখি থাকে মুক্ত পরিবেশে আর দর্শনার্থীরা থাকে নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে। তবে এখনো সাফারি পার্কের প্রাণীগুলো রাখা হচ্ছে নির্ধারিত বেস্টনীতে।

 

পার্কের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি বরাদ্দে ১২৬ কোটি টাকার বিপরীতে মেগাউন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চারবছর আগে ২০২১ সালে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ শুরু করা হয়। নানাবিধ জটিলতায় গৃহীত মেগাউন্নয়ন প্রকল্পের ১২৬ কোটি টাকার সিংহভাগ বরাদ্দ বাতিল হলেও এখনো ওই প্যাকেজের আওতায় সুচারুভাবে অনেকগুলো অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ এগিয়ে চলছে। কাজগুলো বাস্তবায়ন করা শেষ হলে আগামী কয়েকবছরের মধ্যে উন্নতদেশের আদলে একটি পুনার্ঙ্গ সাফারি পার্কে উপনীত হবে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বত্ব ২০২৪-২০২৫ টেলিগ্রাম নিউজ | সম্পাদক : জসিম উদ্দিন

প্রিন্ট করুন