নির্বাচনকালীন সময়ে দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ। তিনি বলেছেন, শিকারী ও দালাল সাংবাদিকতা দেশের গণতান্ত্রিক অর্জনকে বারবার ম্লান করেছে। বর্তমানে আবারও বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ তৈরির অপচেষ্টা চলছে, যা নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে কক্সবাজার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে পিআইবি আয়োজিত নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতা বিষয়ক দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
ফারুক ওয়াসিফ বলেন, কক্সবাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক জনপদ। বহু সভ্যতার ছাপ রয়েছে এ অঞ্চলে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান—এই দুই অর্জনই এসেছে মানুষের রক্তের বিনিময়ে। এসব অর্জন রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জনের ভেতরে কৌশলে ফ্যাসিবাদের দোসররা ঢুকে পড়েছে। অতীতেও শিকারী সাংবাদিকতা জঙ্গিবাদী ন্যারেটিভ তৈরি করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নির্যাতনের পথ প্রশস্ত করেছে। এখনো একই ধরনের অপতৎপরতা নতুন করে শুরু হয়েছে, যা দেশকে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ফারুক ওয়াসিফ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘হাসিনা না ফিরলেও ফ্যাসিবাদ কি সত্যিই আমরা রুখতে পারব—এই প্রশ্ন সামনে এসেছে। আবার কি দালাল সাংবাদিকতার উত্থান ঘটছে, সেটিও ভাবনার বিষয়।’
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ সবসময় জমিদারি কায়দায় জেঁকে বসে। সাংবাদিকরা যখন নীরব থাকেন, তখনই ফ্যাসিবাদ শক্তিশালী হয়।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা বহু সাংবাদিক ভোট দিতে পারেননি—এটি দেশের গণতান্ত্রিক বাস্তবতার একটি করুণ চিত্র।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার কথা উল্লেখ করে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ওই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বিপ্লব, সংস্কার ও ফ্যাসিবাদের বিদায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই চেতনা দুর্বল ও বিভক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশে নির্বাচনী উৎসবের আবহ থাকলেও জুলাইয়ের শহীদ ও আহতরা আজ উপেক্ষিত, যা লজ্জাজনক। অথচ তাঁরাই ছিলেন আন্দোলনের প্রধান প্রেরণা।
বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ে নির্বাচন ও গণভোটের দিকে যাচ্ছি, যা মূলত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গড়ে উঠেছে। এই কাঠামো দিয়ে কতটা সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন ও গণভোটে অংশ নেওয়া অনেকেই জুলাই সনদ সম্পর্কে অবগত নন। এমনকি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ বাদ যাবে—এমন বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারও চালানো হচ্ছে।
সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কার কোনো একদিনের কাজ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। পাশাপাশি ‘মব’ শব্দটিকে ঘিরে বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্র চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সবশেষে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে সাংবাদিকদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে। এই প্রশিক্ষণ কর্মশালা সেই প্রচেষ্টারই একটি অংশ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী ও কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারী বক্তব্য দেন। প্রশিক্ষণ সমন্বয়ক হিসেবে রয়েছেন পিআইবির প্রশিক্ষক সাহানোয়ার সাইদ শাহীন।
দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালায় নির্বাচনকালীন রিপোর্টিং, সাংবাদিকতার নৈতিকতা, ফ্যাক্টচেকিং ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হবে। এতে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের শতাধিক সাংবাদিক অংশগ্রহণ করছেন।
#####

টেলিগ্রাম ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৬:৫৮ অপরাহ্ণ