উখিয়ার আলোচিত নারী হত্যা ‎ওসি মুজিবুর রহমানের আশ্বাসে নির্ভয়ে ঘরে থাকছে, দাপটে ঘুরছে আসামিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬ । ২:২০ অপরাহ্ণ

কক্সবাজারের উখিয়ায় ছেলেকে রক্ষা করতে গিয়ে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলায় নিহত হন ৫৫ বছর বয়সী ছৈয়দা খাতুন। ঘটনার প্রায় ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও মামলার কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি উখিয়া থানা পুলিশ। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

গত ১৬ মে রাতে উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের টাইপালং এলাকায় নিজের ছেলেকে হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে নির্মম হামলার শিকার হন ছৈয়দা খাতুন। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ১৮ মে নিহতের ছেলে আব্দুর রহমান বাদী হয়ে উখিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৭ থেকে ৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।

 

নামীয় আসামিদের মধ্যে রয়েছেন উখিয়া উপজেলা বিএনপির সদস্য মিজান সিকদার, তার ছেলে ছাত্রদল নেতা হাসেম সিকদার জিসান, ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুল করিম, তার ছেলে ছাত্রদল নেতা জুলফিকার আকাশ, ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ বাবুল, রাজাপালং ইউনিয়ন শ্রমিক দলের (দক্ষিণ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম সিকদার, জাহাঙ্গীর আলম, জামাল উদ্দিন, রফিক উদ্দিন ও শামসুল আলম।

 

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নামীয় আসামিদের অধিকাংশই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, মামলা দায়েরের পরও অভিযুক্তরা আত্মগোপনে না গিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। তারা এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন এবং গ্রেফতারের কোনো ভীতি ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। এতে ক্ষোভ বাড়ছে নিহতের পরিবার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে।

 

নিহতের ছেলে এ. এম. ইমরান বলেন, আসামিরা সবাই এলাকায় আছে, বাড়িতে থাকছে। কেউ পালিয়ে যায়নি। আমি প্রতিনিয়ত উখিয়া থানার ওসি ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে আসামিদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছি। পুলিশ একবারের জন্যও এ মামলার আসামিদের ধরতে অভিযান চালায়নি। শুধু বলে, আমরা চেষ্টা করছি।

অথচ আসামিরা দিবালোকে আমার সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং আমাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে।

 

তিনি আরও বলেন,আমার মায়ের জানাজায় বিএনপির নেতারা বলেছিলেন, অপরাধী যে দলেরই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অথচ ১৩ দিনেও দলের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিষয়টি আমাকে খুব হতাশ করেছে।

 

অভিযোগ উঠেছে, মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করার আশ্বাস দিয়েছেন উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমান। এ কারণেই আসামিরা নির্ভয়ে এলাকায় অবস্থান করছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ওসির সঙ্গে কয়েকজন আসামির যোগাযোগ রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে মানববন্ধন করে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে হুমকি-ধমকিও দিয়েছেন।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তরা ৫ আগস্টের পর থেকে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মামলা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বলে আলোচিত। তাদের বিরুদ্ধে থানা-পুলিশকে প্রভাবিত করে নির্বিঘ্নে কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।

 

স্থানীয়দের মতে, ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিএনপির পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বলে তাদের ধারণা।

 

নিহতের ছেলে আব্দুর রহমান শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, তিনি নিরপরাধ কাউকে আসামি করেননি। যারা তার মায়ের ওপর হামলায় অংশ নিয়েছে এবং যাদের তিনি নিজ চোখে দেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি মায়ের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

 

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন মায়ের হত্যাকাণ্ডের মতো আলোচিত ঘটনায় ১৩ দিনেও যদি কোনো আসামি গ্রেফতার না হয় এবং অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়ায়, তাহলে বিচার প্রক্রিয়া ও আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা কীভাবে বজায় থাকবে?

 

জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সুস্ময় দাস গুপ্ত জানান, তিনি বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন।

 

অভিযোগের বিষয়ে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

প্রকাশ্যে অবস্থান করলেও কোনো আসামি গ্রেফতার না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) অহিদুর রহমান বলেন, “আসামিদের গ্রেফতার না করার কোনো সুযোগ নেই। আমি এখনই ওসি ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।

 

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

স্বত্ব ২০২৪-২০২৫ টেলিগ্রাম নিউজ | সম্পাদক : জসিম উদ্দিন

প্রিন্ট করুন