কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক (পোর্ট এক্সেস রোড) নির্মাণ প্রকল্পে বালু উত্তোলন ও মূল্য নির্ধারণের নামে শত শত কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় রাজস্ব লুটের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে জনস্বার্থে একটি রিট মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত সোমবার (১৫ জুন) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোহানা শারমিন এ রিট আবেদনটি দায়ের করেন। রিটে কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলীয় এলাকা থেকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমোদন এবং নামমাত্র মূল্য নির্ধারণের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাতিল চাওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালত রিটটি গ্রহণ করে আগামী রোববার (২১ জুন) শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
#রয়্যালটি ফাঁকির অভিনব কৌশল
রিটের নথিসূত্রে জানা যায়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ঘনফুট বালুর ভিত্তিমূল্য (রয়্যালটি) ৬ টাকা ৯৪ পয়সা নির্ধারিত। তবে ড্রেজিং ব্যয় বাবদ ৪ টাকা ৫৭ পয়সা কর্তন দেখিয়ে কার্যত প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা। এই কৌশলে সংশ্লিষ্ট যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘তোকিউ-এমআইএল-জেভি’ (Tokyu-MIL-JV)-কে বিশেষ আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্র বিপুল অঙ্কের নিশ্চিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আইনজীবীদের মতে, ‘বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী যেকোনো সরকারি প্রকল্পে বালু সরবরাহ বা ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই প্রকল্পে কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এককভাবে বালু উত্তোলন ও সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘন।
মামলায় বিবাদী (রেসপনডেন্ট) করা হয়েছে— কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি); ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব; বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালক; বিআইডব্লিউটিএ কক্সবাজার (কস্তুরীঘাট) বন্দরের সহকারী পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন); সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মাতারবাড়ী বন্দর এক্সেস রোড প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী); কক্সবাজারের গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং তোকিউ-এমআইএল-জেভি যৌথ উদ্যোগের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে।
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল দৈনিক যুগান্তরে প্রিন্ট ও অনলাইন ভার্সনে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বালুতেই ঠিকাদারের পকেটে যাবে ৪৫০ কোটি টাকা” শিরোনামে দাবি করা হয়, মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড প্রকল্পে ব্যবহৃত বালু সরবরাহকে কেন্দ্র করে সরকারের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার রাজস্ব সুবিধা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলনের রয়্যালটি প্রতি ঘনফুট ৬ টাকা ৯৪ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও ড্রেজিং ব্যয় সরকারি কোষাগার থেকে বহন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারি রাজস্ব হিসাবে জমা হবে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা।
রিট আবেদনে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের স্বাক্ষরে এই বালু উত্তোলনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। রিটকারীর অভিযোগ— এই অনুমোদনের আগে কোনো ধরনের বিকল্প প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়নি, এমনকি নেওয়া হয়নি পরিবেশগত ছাড়পত্র বা পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ)।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, যথাযথ ইআইএ (EIA) ছাড়া মহেশখালী উপকূলের সমুদ্র থেকে এই বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হলে উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং পুরো ভূপ্রকৃতি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
রিটকারী আইনজীবী সোহানা শারমিন বলেন,
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষা করা এবং এর অপচয় ও অপব্যবহার রোধ করা প্রতিটি নাগরিক ও প্রশাসনের পবিত্র সাংবিধানিক দায়িত্ব। দেশের সম্পদ থেকে যেখানে সরকারের সর্বোচ্চ ন্যায্য রাজস্ব আদায়ের কথা, সেখানে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্যাকডোর দিয়ে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যা সরাসরি জনস্বার্থের পরিপন্থী।
তিনি আরও বলেন, “আমরা রিট আবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করেছি, প্রচলিত ‘বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন করে এবং উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা বা ডিপিপি (DPP) যথাযথভাবে না দেখেই সম্পূর্ণ আইন পরিপন্থী উপায়ে এই বালু উত্তোলনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একক সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
লোপাটের মূল আয়োজনটি সাজানো হয়েছে বালুর দাম নির্ধারণ এবং উত্তোলনের পরিমাণের আড়ালে। আমরা জানতে পেরেছি, এই প্রক্রিয়ায় পুরো প্রকল্পে অন্তত ৫০ কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হবে। আর সরকারের কাছ থেকে এসব বালুর মূল্য বাবদ প্রতি ঘনফুট ৪৭ টাকা থেকে শুরু করে ১১৭ টাকা পর্যন্ত তুলে নেওয়া হবে! অথচ ড্রেজিং খরচ সমন্বয়ের নামে রাষ্ট্রকে প্রতি ঘনফুটে রয়্যালটি দেওয়া হচ্ছে নামমাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা। অর্থাৎ একদিকে নামমাত্র রয়্যালটি দেখিয়ে রাষ্ট্রকে ঠকানো হচ্ছে, অন্যদিকে আকাশচুম্বী মূল্যে সরকারের কাছ থেকেই বিল তুলে নিয়ে শত শত কোটি টাকা লোপাটের স্পষ্ট সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই সাধারণ জনগণের স্বার্থের সাথে যায় না।
তাছাড়া, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ছাড়া এই বালু উত্তোলন পরিবেশ সংরক্ষণ আইনেরও পরিপন্থী।
এসব কারণেই আমরা মহামান্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি এবং এই অবৈধ ও জনস্বার্থবিরোধী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা অবিলম্বে স্থগিত করাসহ রুল জারির আর্জি জানিয়েছি। আদালত আমাদের রিটটি গ্রহণ করে শুনানির দিন ধার্য করেছেন। আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করছি, মহামান্য হাইকোর্ট দেশের সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় একটি ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তমূলক নির্দেশনা দেবেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬ । ৪:২১ অপরাহ্ণ