‘হ্যান্ড অব গডের’ ৪০ বছর পূর্তি আজ, যে রাতে অমর হয়েছিলেন ম্যারাডোনা

টেলিগ্রাম ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ । ৭:৪১ অপরাহ্ণ

৪০ বছর পূর্তি

ফকল্যান্ড যুদ্ধের ৪ বছর পর মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটাকেই প্রতিশোধের যথার্থ মঞ্চ বানিয়ে ফেলেছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। ২২ জুন, বিকেলে ১ লাখের বেশি দর্শককে স্বাক্ষী রেখে পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার ছোটখাট মানুষটা জন্ম দিলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তের। মাত্র ৪ মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল, যা আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি ম্যারাডোনাকে দিয়েছে অমরত্ব; কারো চোখে ইতিহাসের নায়ক, কারো কাছে চরম বিতর্কিত এক খলনায়ক।

সোমবার (২২ জুন) রাতে ডালাস স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলতে নামছে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। কাকতালীয়ভাবে দিনটি মিলে গেছে ৪০ বছর আগের এক বিখ্যাত ঘটনার সঙ্গে। সেদিন অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে এক আর্জেন্টাইন পেয়েছিলেন অমরত্বের স্বাদ। একই ম্যাচে ৫১ ও ৫৬ মিনিটে মাত্র ৪ মিনিটের ব্যবধানে ফুটবলের এই মহান গল্পকার জন্ম দিয়েছিলেন ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে বিখ্যাত দুই গল্পের।

হ্যান্ড অব গড: কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচের গোলশূন্য প্রথমার্ধ দেখে কেউই আশা করেনি দ্বিতীয়ার্ধে তাদের জন্য কী বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। দ্বিতীয়ার্ধের ৬ মিনিটে ম্যারাডোনা নিজেদের বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সতীর্থ হোর্হে ভালদানোকে পাস দেন। ভালদানো কয়েকজন ইংলিশ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এগোনোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বলটি প্রতিপক্ষের দখলে চলে যায়। এরপর কয়েকবার এদিক-ওদিক হওয়ার পর ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার স্টিভ হজ বলটি নিজেদের গোলের দিকে উঁচু করে ক্লিয়ার করেন।

খেলোয়াড়দের অবস্থানের কারণে ম্যারাডোনা অফসাইডে পড়তে পারতেন, কিন্তু বলটি যেহেতু একজন ইংলিশ খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে এসেছিল, তাই অফসাইডের কোনো অপরাধ হয়নি। পেনাল্টি বক্সে একা দাঁড়িয়ে থাকা ম্যারাডোনা নিচে নামতে থাকা বলটির জন্য ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন। শিলটন উচ্চতায় ম্যারাডোনার চেয়ে প্রায় ২০ সেন্টিমিটার (৮ ইঞ্চি) বেশি ছিলেন।

শিলটন ডান হাত উঁচিয়ে সামনে ঝাঁপ দেন, আর ম্যারাডোনা বাঁ হাত প্রসারিত করে লাফিয়ে ওঠেন। মারাডোনার মাথার কাছে তোলা মুষ্টিবদ্ধ বাঁ হাতটি সবার আগে বলে স্পর্শ করে। ফলে বলটি শিলটনের মাথার ওপর দিয়ে লুপ খেয়ে জালে ঢুকে যায়।

গোল হওয়ার পর ম্যারাডোনা উদযাপন শুরু করেন, তবে একই সঙ্গে পাশ ফিরে রেফারি ও লাইন্সম্যানের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হতে চান যে গোলটি দেওয়া হয়েছে কি না। গোলের স্বীকৃতি পাওয়ার পর তিনি পূর্ণ উদযাপনে মেতে ওঠেন।

তিউনিসিয়ার রেফারি আলি বিন নাসের প্রথমে গোলটি মেনে নেন। তবে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তিনি তার সহকারী লাইন্সম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করেন। লাইন্সম্যান গোলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।

ম্যাচের পর ম্যারাডোনা অ্যাজটেকার ড্রেসিং রুমে ‘ক্রোনিকা’কে বলেছিলেন, ‘গোলটি হয়েছিল একটু আমার মাথা দিয়ে, আর একটু ঈশ্বরের হাত (হ্যান্ড অব গড) দিয়ে।’ তখনই প্রথম ‘হ্যান্ড অব গড’ শব্দটি উঠে আসে এবং পরবর্তীতে এই বিতর্কিত গোলটি এই নামেই পরিচিতি পায়।

সেই গোলের ১২ বছর পর ১৯৯৮ সালে ম্যারাডোনা এক ডকুমেন্টারিতে বলেন, ‘আমি ইংরেজদের অজান্তে তাদের মানিব্যাগ চুরি করেছি, একবারও চোখের পলক না ফেলে। শিলটন, সব গোলকিপারই বোকা, আর তুমি তার ব্যতিক্রম নও।’

মেক্সিকান ফটোগ্রাফার আলেহান্দ্রো ওহেদা কার্বাহাল সেদিন সেই মুহূর্তটি ছবিতে ধারণ করেন, যেখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায় ম্যারাডোনা গোল করার ঠিক আগমুহূর্তে তার বাঁ হাত দিয়ে বলটি স্পর্শ করেছিলেন।

২০০৫ সালে, সেই গোলের ১৯ বছর পর, ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনার টেলিভিশন অনুষ্ঠান লা নোচে দেল টেনে স্বীকার করেন যে তিনি সেই গোলটি হাত দিয়ে করেছিলেন। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ম্যারাডোনার এই স্বীকারোক্তি/ক্ষমা প্রার্থনার খবর প্রকাশ করে, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটন সেই ক্ষমা প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, এটি অনেক দেরিতে এসেছে।

গোল অব দ্য সেঞ্চুরি: ম্যারাডোনার সেই হাত দিয়ে করা গোলের বিতর্কের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে একই ম্যাচে ৪ মিনিট পর করা তার অসাধারণ সেই গোল। যে গোলকে বিশ্বকাপ তো বটেই, ফুটবল ইতিহসেরই সেরা গোলের মর্যাদা দেয়া হয়।

ম্যাচের ৫৬ মিনিটে নিজের অর্ধে পাস পান ম্যারাডোনা। এরপরই তিনি শুরু করেন তার ৬০ গজ, ১০ সেকেন্ডের সেই দৌড়, যেখানে তিনি একে একে পিটার বিয়ার্ডসলি, পিটার রিড, টেরি বুচার (দুবার) এবং টেরি ফেনউইক এই চার ইংলিশ আউটফিল্ড খেলোয়াড়কে কাটিয়ে যান।

 

এই আক্রমণ শেষ হয় ম্যারাডোনার এক চমৎকার ফেইন্টে, যা গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে মাটিতে ফেলে দেয়, এরপর তিনি বলটি ফাঁকা জালে ঠেলে দেন।স্কোর ২–০, আর্জেন্টিনার পক্ষে।

পরবর্তীতে গোলটি সম্পর্কে মারাদোনা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আসলে ভ্যালদানোকে পাস দেওয়ার জন্য খেলাটি শুরু করেছিলাম, কিন্তু যখন আমি বক্সে পৌঁছাই, তারা আমাকে ঘিরে ফেলে এবং আমার কোনো জায়গা ছিল না। তাই আমাকে আক্রমণ চালিয়ে নিজেই শেষ করতে হয়েছে।’

তিনি পরে ইংল্যান্ড দলের ফেয়ার প্লে-এর প্রশংসাও করেন, বলেন, ‘আমি মনে করি না আমি এটা অন্য কোনো দলের বিপক্ষে করতে পারতাম, কারণ তারা সবাই আপনাকে ট্যাকল করে ফেলে দিত। তারা সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে ভদ্র দলগুলোর একটি।’

২০০২ ফিফা বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ফিফার ওয়েবসাইটে এই গোলটি ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে নির্বাচিত হয়। এটি ইংল্যান্ডের মাইকেল ওয়েনের ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে করা গোলকে হারিয়ে প্রথম হয়, আর ম্যারাডোনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপের আরেকটি গোল (বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেমিফাইনাল) চতুর্থ স্থান পায়।

স্প্যানিশভাষী দেশগুলোতে এই গোলটি সাধারণত উরুগুয়ের সাংবাদিক ভিক্টর হুগো মোরালেসের আবেগঘন লাইভ ধারাভাষ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তার স্প্যানিশ ধারাভাষ্যের অনুবাদ অনেকটা এমন, ‘“এখানে ম্যারাডোনা… দুইজনকে কাটাল… ম্যারাডোনা বল নিয়ে দৌড়াচ্ছে… জিনিয়াস, জিনিয়াস, জিনিয়াস… গোল! গোল! আমি কাঁদতে চাই… ঈশ্বর! ফুটবলের জন্য ধন্যবাদ… ম্যারাডোনা… কী অসাধারণ গোল!”’

ম্যাচের ৮১ মিনিটে ইংল্যান্ডের হয়ে একটি গোল শোধ করেন গ্যারি লিনেকার।

সেই ম্যাচের ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও আলোচনা থামেনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ম্যারাডোনা নিজেও সেই দুই গোলের মোহগ্রস্ত দশা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ইনফোবায়েতে ২০২০ সালে, জীবনের শেষ দিকের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ওই গোলটা আমাকে এখনো নাড়িয়ে দেয়, কারণ আমি এতে সবসময় নতুন কিছু খুঁজে পাই। শিলটনের ভুল ক্লিয়ারেন্স বা ব্ল্যাক এনরিকের পাস, কারণ অন্য কেউ হলে শুধু বলটা দূরে মেরে দিত, কিন্তু সে আমাকে দেখে পাস দিয়েছিল। সময়ের সঙ্গে আমি বলেছি দ্বিতীয় গোলটা করেছি যেন কেউ না বলতে পারে আমি হাতে এক গোল করেছি।’

স্বত্ব ২০২৪-২০২৫ টেলিগ্রাম নিউজ | সম্পাদক : জসিম উদ্দিন

প্রিন্ট করুন