ধর্ষণের দায়ে এক থানার ৭৮ পুলিশ সদস্য ও কর্মচারী বরখাস্ত!
পাকিস্তানের লাহোরের একটি থানায় ২০ বছর বয়সী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে ওই থানার সব পুলিশ কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দেশটির পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহৎ শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা বলে মনে করা হচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ওই তরুণীকে আটক করে লাহোরের গাজিয়াবাদ থানায় নিয়ে যান। পরে থানার দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে তাকে ধর্ষণ করা হয়। তরুণীর পরিবারের দাবি, তিনি রাস্তায় নিখোঁজ হওয়ার পর কান্নাকাটি করতে করতে বাড়ি ফিরে জানান, থানার ভেতরেই তাকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
অভিযুক্ত এএসআইকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে মঙ্গলবার গাজিয়াবাদ থানার ৭৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
লাহোর পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (অপারেশনস) ফয়সাল কামরান দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, পুলিশি বিধিমালা অনুযায়ী থানার ভেতরে কোনো ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ ও তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব। কিন্তু এ ঘটনায় তারা সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।
তিনি বলেন, “কোনো পুলিশ সদস্য প্রশ্ন তোলেননি যে, কেন ওই সহকারী উপপরিদর্শক কোনো নারী পুলিশ সদস্য ছাড়া ওই তরুণীকে থানায় নিয়ে এসেছিলেন।”
ফয়সাল কামরান আরও বলেন, “আমি থানার ৭৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছি। জেন্ডার ক্রাইম উইং ঘটনাটি তদন্ত করছে। দোষীদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে এবং শহরের সব থানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনাটি পাকিস্তাজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, সামাজিক কলঙ্কের ভয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থার অভাবের কারণে অনেক নারী যৌন সহিংসতার অভিযোগ জানাতে সাহস পান না। তাদের মতে, পুলিশের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ জনসাধারণের আস্থা আরও দুর্বল করে দিয়েছে।
নারী অধিকারকর্মী ফারজানা বারি বলেন, “এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনা এবং পুলিশ বাহিনীর দীর্ঘদিনের জবাবদিহিতার অভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এটি ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি নির্মম উদাহরণ। পুলিশের অসদাচরণ ও হেফাজতে ধর্ষণের অভিযোগ নতুন নয়; বছরের পর বছর আমরা এমন ঘটনা দেখে আসছি।”
তিনি বলেন, “১৯৯০-এর দশকে আমরা নারী পুলিশ স্টেশন প্রতিষ্ঠার দাবিতে নিরলসভাবে আন্দোলন করেছি, কারণ অনেক নির্যাতিত নারী পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানাতে নিরাপদ বোধ করতেন না। নারীদের সুরক্ষায় পুলিশের রেকর্ড এখনও দুর্বল হলেও, অন্তত এ ঘটনার অভিযোগটি সামনে এসেছে— এতে আশা করা যায়, ভুক্তভোগী বিচার পাবেন।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইন সংস্কার হলেও পাকিস্তানে ধর্ষণের ঘটনায় দণ্ডাদেশের হার এখনও খুবই কম। সাসটেইনেবল সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে ধর্ষণ মামলায় দণ্ডাদেশের হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। আর সরকারি তথ্য বলছে, ঘটনাস্থল পাঞ্জাব প্রদেশে ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৪ শতাংশ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, দুর্বল তদন্ত, যথাযথ আলামত সংগ্রহে ব্যর্থতা, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং যৌন সহিংসতা নিয়ে সামাজিক কলঙ্ক— এসব কারণেই দণ্ডাদেশের হার এত কম।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পাঞ্জাব প্রদেশে নারীদের বিরুদ্ধে ২০ হাজারের বেশি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় বেশি।
ফারজানা বারি বলেন, “রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অপরাধ চলতেই থাকবে। সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার এবং আরও শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা।”

আপনার মতামত লিখুন