ডিএনসিসির টেন্ডারনামা
জুলাই হত্যা মামলার আসামি পাঁচ আ.লীগ নেতাকে ৮০৫ কোটির কাজ দিল ডিএনসিসি
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন যুবলীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আবদুল হাই। সাত মাসের মাথায় জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভারতে পালিয়ে যান। সেখান থেকে যান নেপালে। পরে দেশে ফিরে সক্রিয় হন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিংয়ে। ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তান থেকে গ্রেপ্তার হন। মুগদা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার এই আসামি এখন ডিএনসিসির সবচেয়ে বড় ঠিকাদার। আবদুল হাইসহ জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামি পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ৮০৫ কোটি টাকার কাজ দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৫ অক্টোবর। এই এক বছর তিন মাসে ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ দিয়েছে ডিএনসিসি। এই সময়ে কাজ পাওয়া ১৯৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫টির হাতে গেছে মোট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ।
আবদুল হাইয়ের মতো আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট অন্য ঠিকাদাররাও ডিএনসিসির বড় অঙ্কের কাজ পেয়েছেন। শুধু পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার ছয় প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়া হয়েছে ৮০৫ কোটি টাকার কাজ। এটি একই সময়ে দেওয়া মোট কাজের প্রায় ২৯ শতাংশ।
পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার ছয় প্রতিষ্ঠান
ডিএনসিসির কাজ পাওয়া পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার ছয়টি প্রতিষ্ঠান হলো মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড, আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, এম এস আলিফ ট্রেডার্স, ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ও জনি এন্টারপ্রাইজ। এর সবকটির মালিকদের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে।
আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে মুগদা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে। এ ছাড়া পল্টন মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা আছে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে গুলিস্তান ও পল্টন এলাকায় মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া এবং অর্থ জোগানোর অভিযোগে পল্টন মডেল থানায় এই দুই মামলা হয়।
মুগদা থানার মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও সেটি গোপন করে পল্টন থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিনে মুক্তি পান আবদুল হাই। তার প্রতিষ্ঠান আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এখন ডিএনসিসির বড় ঠিকাদার।
আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের একই ঠিকানায় রয়েছে এম এস আলিফ ট্রেডার্স। কাগজে-কলমে দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক আলাদা। এম এস আলিফ ট্রেডার্সের লাইসেন্স আবদুল হাইয়ের ভাতিজা এবং অফিসের কর্মচারী আবু বক্কর সিদ্দিকের নামে। ওই লাইসেন্স ব্যবহার করে এবং আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে একক ও যৌথভাবে কাজ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে গত ৫ অক্টোবর পর্যন্ত এভাবে ডিএনসিসি থেকে ৫৭টি দরপত্রে ৩০২ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, নয়াপল্টনের ইনার সার্কুলার রোডের ৫০/১ নম্বর রিজ আহমেদ স্কয়ারের ১১ তলায় একই ফ্লোরে চারটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। এগুলো হলো আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, এম এস আলিফ ট্রেডার্স, জান্নাত ট্রেডার্স এবং ওয়াই এন্ড এস ট্রেডিং। সবকটির লাইসেন্স নেওয়া হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে।
এম এস আলিফ ট্রেডার্সের স্বত্বধিকারী মোহাম্মদ আবু বক্কর সিদ্দিকি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি চাচার কোম্পানিতে স্টাফ হিসেবে আছি। এম এস আলিফ ট্রেডার্সের লাইসেন্স আমার নামে করা। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানও আমাদের নামে।’
একই ঠিকানায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়ার বিষয়ে কথা হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা আতাহার আলী খানের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘একই ভবনের একই ফ্লোর ব্যবহার করে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়া অনৈতিক। করপোরেশন থেকে এ ধরনের লাইসেন্স দেওয়া হয় না। এটি খতিয়ে দেখতে হবে যে তারা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে একই ঠিকানায় একাধিক লাইসেন্স নিয়েছে কি না। এমন হয়ে থাকলে লাইসেন্স বাতিল করা হবে।’
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের পর আবদুল হাই ভারত ও নেপালে পলাতক ছিলেন। পরে দেশে ফিরে সরকারবিরোধী নানা তৎপরতা শুরু করেন।
মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মালিক মোহাম্মদ পারভেজ কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। মিরপুর মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে।
এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেডের মালিক এইচ এম হেলাল। তিনি ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানের ছোট ভাই। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি তাদের পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর উত্তরা পশ্চিম থানায় হেলালের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়। এজাহারে তাকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা-১৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের ঘনিষ্ঠ পাগলা মিজান। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী ও আসাদগেট এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগ আছে তার বাহিনীর বিরুদ্ধে। তখন আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহকারী হিসেবে পাগলা মিজানের নাম সামনে আসে। হেলালের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আমলে পাগলা মিজানের প্রভাবে ডিএনসিসি ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে একচেটিয়া টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
জনি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী দিলীপ কুমার ঘোষ। ভাটারা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার এজাহারে তাকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দিলীপ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্তের ব্যবসায়িক অংশীদার।
ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ৬০ ভাগ শেয়ারের মালিক ফরিদ আহমেদ ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য। বাকি ৪০ ভাগ স্ত্রী রামেহা আহমেদ রোজা নামে দিয়ে তাকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে রাখা হয়েছে। ফরিদের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে।
২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার কাজ
ই-জিপির তথ্য ও এশিয়া পোস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে গত ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএনসিসিতে ৫৬৮টি কার্যাদেশ হয়েছে। এসব কাজের মোট মূল্য ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫২৫টি দরপত্রে ২ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকার কাজ হয়েছে উন্মুক্ত দরপদ্ধতিতে (ওটিএম)।
সীমিত দরপদ্ধতিতে (এলটিএম) হয়েছে ৬৪ লাখ টাকার একটি কাজ। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সিঙ্গেল সোর্স ও আরএফকিউ (কোটেশন চেয়ে কাজ দেওয়ার পদ্ধতি) পদ্ধতিতে ৪২টি কাজ হয়েছে ২০ কোটি ৪৮ লাখ টাকায়।
এসব দরপত্রে কাজ করেছে ১৯৩টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ১০৪টি প্রতিষ্ঠান একটি করে কাজ পেয়েছে। একাধিক কাজ করেছে ৮৯টি। তাদের মধ্যে ২৫টি প্রতিষ্ঠান ২৪০টি দরপত্রে ১ হাজার ৯১০ কোটি টাকার কাজ করেছে। এটি মোট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগ নেতাদের বা তাদের ঘনিষ্ঠদের প্রতিষ্ঠান।
এশিয়া পোস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এক বছর তিন মাসে ডিএনসিসিতে এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড ২৪টি দরপত্রে ১৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার কাজ করেছে। মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ১৩টি দরপত্রে ১৫৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার কাজ করেছে। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড করেছে ১২৮ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ।
আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এবং এম এস আলিফ ট্রেডার্স যৌথভাবে ১৪টি দরপত্রে ১৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ করেছে। এম এস আলিফ ট্রেডার্স এককভাবে ১৯টি দরপত্রে করেছে ৩৬ কোটি টাকার কাজ। দুই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা নয়াপল্টনের ইনার সার্কুলার রোডের ৫০/১ রিজ আহমেদ স্কয়ারের ১১ তলা।
জনি এন্টারপ্রাইজ চারটি দরপত্রে ৯৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং আটটি দরপত্রে ১০৬ কোটি টাকার, জামান কনসোর্টিয়াম ১১টি দরপত্রে ৯৮ কোটি ২৫ লাখ টাকার এবং এমআর এন্টারপ্রাইজ পাঁচটি দরপত্রে ৮৪ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে জামান কনসোর্টিয়ামের মালিক মো. কামরুজ্জামান ভূঁইয়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

আপনার মতামত লিখুন