মহেশখালী থানার ওসির কান্ড
১০ বছর আগে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তির নামে চাদাঁবাজি ও লুটপাটের মামলা
মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের অমাবশ্যাখালী এলাকায় চিংড়ি ঘের দখলকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা, মোটা অংকের চাঁদা দাবি, ব্যাপক লুটপাট এবং এর পরপরই ঘটনার শিকার পক্ষের বিরুদ্ধেই পাল্টা মামলায় মৃত ব্যক্তি ও নীরিহ মানুষকে আসামী করার ঘটনায় এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশকে টাকা দিয়ে যদি এভাবে পেছন থেকে শক্তিশালী অপরাধীচক্র মামলা সাজাতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? বিশেষ করে দশ বছর আগে প্রবাসে মারা যাওয়া এক মৃত ব্যক্তিকে আসামি বানিয়ে তাকে চাঁদাবাজ বানানোর নজির দেশের আইনি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।
চিংড়ি চাষি এনামুল করিম অভিযোগ করেন, তার পৈত্রিক মালিকানাধীন চিংড়ি ও লবণ চাষের জমিতে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক মামলার আসামিরা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। তাদের বিরুদ্ধে একাধিকবার চাঁদা দাবি ও সশস্ত্র হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ গত ১৩ জুলাই গভীর রাতে ১৯ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তার চিংড়ি ঘেরে হামলা চালায়। হামলার আহত কর্মচারীদের রশি দিয়ে বেঁধে খালের পানিতে ফেলে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এরপর হাতে বন্দুক দিয়ে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে জোর করে স্বীকার করানোর চেষ্টা করা হয়।
ঘেরের বাসা ভাঙচুর, বাঁধ কেটে মাছের পোনা নষ্ট করা এবং প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগও মামলায় উল্লেখ করা হয়। চাষযোগ্য মাছ ও কাঁকড়াসহ প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকার সম্পদ লুটে নেওয়া হয়। শ্রমিকদের ব্যবহৃত চারটি মোবাইল ফোনও ছিনিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন এনামুল।
এ ঘটনায় ভূক্তভোগী এনামুল করিম ২১ জুলাই মহেশখালী থানায় ১৯ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নম্বর ৩৫। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ডাকাতি, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতনসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
তবে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, মামলা দায়েরের চারদিন পর ২৫ জুলাই অভিযুক্ত পক্ষের নুরুল কবির নামের এক ব্যক্তি থানায় এনামুল ও তার এক মৃত ভাই সহ ২২ জনের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নম্বর ৩০।
সেই মামলার ১৭ নম্বর আসামি হলেন এনামুল করিমের ছোট ভাই মাহমুদুল করিম। যিনি ১০ বছর আগে মালয়েশিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর ডেথ সার্টিফিকেট ও দাফনের কাগজপত্র এনামুল হকের কাছে রয়েছে বলে জানান। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মামলায় তাকে চাঁদাবাজি ও লুটপাটের মূলহোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়াও মামলায় যাদের নাম রয়েছে, তাদের অনেকে ঘটনার সময় এলাকায়ই ছিলেন না। এমনকি ঘটনার স্থানও উল্লেখ করা হয়েছে অন্য এলাকায়, যা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পাল্টা মামলা দায়েরের জন্য বাদীপক্ষ থানার ওসিকে মোটা অংকের টাকা দিয়েছেন। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীদেরকেই হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এনামুল করিম ও তার পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, ওসির ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করা হোক এবং প্রকৃত হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক। তারা বলেন, যদি এই ঘটনাও ধামাচাপা পড়ে যায়, তাহলে পুলিশি অপব্যবহার ও সন্ত্রাসী জোটের অপতৎপরতা আরও ভয়ংকর রূপ নেবে।
পাল্টা মামলার বিষয় ও মৃত ব্যাক্তিকে কেন আসামী করা হয়েছে জানতে চাইলে নুরুল কবির জানান, ভুলে মৃত ব্যাক্তির নাম চলে এসেছে। এটা টাইপিং মিস্টেক হতে পারে। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পাল্টা মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে সামনাসামনি দেখা করতে বলে ফোন কেটে দেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলা পাল্টা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাব ইন্সপেক্টর মোঃ এনায়েত কবীর বলেন, উভয় পক্ষের মামলা দায়ের বা পাল্টা মামলায় মৃত ব্যাক্তি আসামীর কিছুই জানি না। থানায় মামলা দায়ের হওয়ার পরে আমার নামে এন্ডোস করেছে। তদন্তে যদি কোন নীরিহ ব্যাক্তি পাওয়া যায় তাকে বাদ দেওয়া হবে।
মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মঞ্জুরুল হক বলেন, থানায় এসে কেউ যদি মামলার এজাহার জমা দেয় তাহলে কারো নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। চার্জশিট দেওয়ার সময় তদন্ত করে নীরিহ কেউ থাকলে বাদ দেওয়া হবে। এছাড়া মহেশখালীর প্রায় লোক চাঁদাবাজির ধারা দিয়ে এজাহার জমা দেয়। মামলা না নিলে আবার বিভিন্নভাবে ব্লেইম দেয়।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন বলেন, মহেশখালীতে দখল-বেদখল নিয়ে বেশিরভাগ সময় থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগ গুলোতে দেখা যায় অনেক বেশি আসামী দেওয়া হয়। যার কারনে সবগুলো আসামীর ক্ষেত্রে তদন্ত করা সম্ভব হয়ে উঠে না। মামলায় নীরিহ বা মৃত ব্যাক্তিকে আসামী করা হলে তদন্ত করে বাদ দেওয়া যাবে। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে যদি মামলা নেওয়ার অভিযোগ উঠে তদন্ত করে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন