কক্সবাজার সমন্বিত কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের কান্ড, দুদক চড়ে অন্যের গাড়িতে
চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীদের বরাদ্দ খাবারে অনিয়ম, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখাসহ নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ জুলাই এনফোর্সমেন্ট অভিযানে যান দুদকের কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।
জেলা শহর থেকে চকরিয়ায় যেতে তারা ব্যবহার করেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ডাবল কেবিন পিকআপ (নম্বর-ঢাকা মেট্রো-ঠ ১৩-৪৭৩৭)। অথচ এলজিইডির একাধিক প্রকল্প নিয়ে ওঠা অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্ত করছে দুদক।
যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন, তাদের গাড়ি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে অভিযানে যাওয়াকে হতাশাজনক বলছেন বিশিষ্টজন। তারা মনে করেন, এসব ঘটনায় তদন্তের ক্ষেত্রে দুদকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
২০২২ সালের ১ জানুয়ারি উদ্বোধন করা হয় দুদক সমন্বিত কক্সবাজার জেলা কার্যালয়। এখান থেকেই পাশের বান্দরবান জেলার কার্যক্রমও পরিচালিত হয়। উদ্বোধনকালে দুদকের তৎকালীন কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক বলেছিলেন, এই কার্যালয়কে জেলা কার্যালয়ে রূপান্তর করা হবে। অথচ চার বছর পরও সেটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি। এখানে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। নেই একটি গাড়িও।
দুদক সূত্র জানায়, এই কার্যালয়ে চারজন সহকারী পরিচালক পদের বিপরীতে আছেন দুজন। উপসহকারী পরিচালকের ছয়টি পদের বিপরীতে তিনজন, পাঁচটি কনস্টেবল পদের বিপরীতে আছেন দুজন। এ ছাড়া প্রসিকিউশন বিভাগে একজন কোর্ট ইন্সপেক্টর, একজন সহকারী কোর্ট ইন্সপেক্টর ও একজন সাব ইন্সপেক্টরের পদ থাকলেও পদায়ন নেই। অথচ এই জেলা কার্যালয়ে আড়াই শতাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তাধীন।
কর্মকর্তারা বেশি সংকটে পড়েছেন গাড়ি না থাকায়। নাইক্ষ্যংছড়ি-গর্জনিয়া বাজার সংযোগ সড়কের সংস্কার কাজে অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে ২৯ এপ্রিল দুদক কর্মকর্তারা এনফোর্সমেন্ট অভিযানে যান। সহকারী পরিচালক অনিক বড়ুয়া বাবুর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ব্যবহার করা হয় কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ল্যান্ডক্রুজার (নম্বর-ঢাকা মেট্রো-ঘ ১১-১৩৪০)।
১০ জুলাই চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের উন্নয়নকাজে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযানে যায় দুদক। সহকারী পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বাধীন দলকেও এদিন ব্যবহার করতে হয় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের গাড়ি।
একই বিভাগের গাড়ি নিয়ে ২৭ জুলাই দুদক কর্মকর্তারা যান জেলার উখিয়ায়। উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হুমায়ুন বিন আহমদ। অথচ এলজিইডি, সওজ এবং বন বিভাগের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ তদন্ত করছে সংস্থাটি। গত এক বছর ধরে তাদের সব এনফোর্সমেন্ট অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে সরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের গাড়ি।
এসব ঘটনায় কোনো কথা না উঠলেও বিব্রত দুদকের কর্মকর্তারা। যদিও তাদের কেউ নাম প্রকাশে রাজি হননি। তিনজন কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয় সমকালের। তারা বলেন, নৈতিকতার জায়গা থেকে এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
কর্মকর্তারা জানান, নিয়ম অনুযায়ী অভিযানে সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে গাড়ি বরাদ্দ দেওয়ার কথা কমিশনের পক্ষ থেকে। যদি কোনো কারণে বরাদ্দ না পাওয়া যায়, তবে অনুমতিসাপেক্ষে ভাড়ায় নিয়ে গাড়ি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ নেই।
কক্সবাজারে সমন্বিত কার্যালয় চালুর হওয়ার পর একটি গাড়ি তারা পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে সেটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা মনে করেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান, তদন্ত বা মামলা চলছে, ওইসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গাড়ি সুবিধা নেওয়া দুর্নীতির মধ্যে পড়ে। দুদকের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এভাবে কাজ করতে পারে না। এ ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
একই রকম মত দিয়ে কক্সবাজার আদালতের এপিপি মুজিবুল হক বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে দুদক স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। যতটুকু জানি, গাড়ি বরাদ্দ দিতে না পারার মতো সংকটে দুদক পড়ে নাই। তারপরও গাড়ি দিতে দেরি হলে ভাড়ায় নিতে পারে। কিন্তু অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গাড়ি নিয়ে এনফোর্সমেন্ট অভিযানে গেলে তা সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হবে, এটাই স্বাভাবিক।’
এমন কোনো তথ্য জানা নেই দুদকের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ আবুল হোসেনের। তাঁর ভাষ্য, এনফোর্সমেন্ট অভিযানগুলো কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয় পরিচালনা করে। তদারকি বা নির্দেশনা দেয় প্রধান কার্যালয়ের গোয়েন্দা বিভাগ।

আপনার মতামত লিখুন