বনভূমি দখল করে এনজিওর অবৈধ রাজত্ব
কক্সবাজার উখিয়ার পাহাড়ি বনভূমি আজ বিপদের মুখে। সরকারি বনভূমি দখল করে দেশি ও আন্তর্জাতিক এনজিও- আইএনজিও অফিস, ওয়্যারহাউস, পশুখামার ও স্থাপনা নির্মাণ করেছে। বন বিভাগ নোটিশ জারি করলেও কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। এতে শুধু সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে না, বন ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসও সংকটে পড়ছে।
ডব্লিউএফপি’র অফিসে বন বিভাগের অভিযান, বাকবিতণ্ডা
মধুরছড়া এলাকায় ডব্লিউএফপি অফিসের নির্মাণ কাজ চলছিল। মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বন বিভাগ কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করলে ডব্লিউএফপির মাঠকর্মীরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান।
উখিয়া রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবদুল মান্নান বলেন,
“সংরক্ষিত বনের জমিতে ডব্লিউএফপি স্থাপনা নির্মাণ করছিল। খবর পেয়ে কাজ বন্ধ করেছি। পুনরায় কাজ শুরু করলে বন বিভাগ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করিয়েছি। বিষয়টি উপরি মহলকে অবহিত করা হয়েছে।”
২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর উখিয়া রেঞ্জ থেকে ব্র্যাক, ডব্লিউএফপি, আইওএম, ইউএনএইচসিআরসহ ছয়টি সংস্থাকে নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে ছয় কর্মদিবসের মধ্যে বৈধ কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু কোনো সংস্থা তা মানেনি। বরং আগের মতোই দখল করা স্থাপনায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার যদি আইনি প্রক্রিয়ায় বনভূমি ইজারা দিত, বছরে কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। কিন্তু এখন অবৈধ দখলবাজরা তা হাতিয়ে নিচ্ছে।
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর ওপর মারাত্মক প্রভাব:
উখিয়া-টেকনাফের বনভূমি একসময় হাতি, হরিণ, বন্যশূকরসহ অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল। এখন দখলকৃত এলাকায় সড়ক কাটা, কাঁটাতারের বেড়া, বিশাল স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। ফলে বন্যপ্রাণীরা স্বাভাবিক আবাস হারাচ্ছে।
বিশেষ করে এশিয়ান হাতির করিডোর বাধাগ্রস্ত। বন সংকোচনের কারণে হাতি মানুষের বসতিতে প্রবেশ করছে, বাড়ছে মানুষ-হাতি সংঘাত।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), কক্সবাজার শহর শাখার সভাপতি ইরফান উল হাসান বলেন,
“উখিয়া-টেকনাফের বনভূমি রোহিঙ্গা সংকটের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এর উপর যত্রতত্র স্থাপনা নির্মাণ হলে পাহাড় ধস, বন উজাড়, বন্যপ্রাণীর বিচরণ ব্যাহত এবং জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে। বনভূমি কোনো সংস্থার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি রাষ্ট্রের সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সুরক্ষা। উন্নয়ন বা মানবিক কার্যক্রমের নামে বন ধ্বংস ও দখল গ্রহণযোগ্য নয়।”
সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় অবৈধ দখল:
উখিয়ার বনভূমি দখলের নেপথ্যে এনজিও- আইএনজিওর সিন্ডিকেট। ওয়ালাপালংয়ের মুহুরীপাড়া এলাকায় মাইশা এন্টারপ্রাইজের বিশাল স্থাপনা স্থানীয়দের প্রবেশও সীমিত করেছে।
মধুরছড়া, কুতুপালং, ফলিয়াপাড়া ও অন্যান্য এলাকায় ওয়্যারহাউস, অফিস এবং পশুখামারের আড়ালে প্রকল্প চালাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থা। সরকারি আদেশ উপেক্ষা করে তারা দাপট দেখাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল ও আন্তর্জাতিক দাতাদের ছত্রছায়ায় এসব কার্যক্রম চলছেই। বন বিভাগের নোটিশ উপেক্ষা করা, প্রশাসনিক উদাসীনতা—সব মিলিয়ে বনভূমি ধ্বংসের পথে।
অপরাধের পেছনের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতি:
বিশ্লেষকরা বলছেন, বনভূমি যদি আইনি প্রক্রিয়ায় লিজে দেওয়া হতো, সরকার বছরে শতকোটি টাকা রাজস্ব পেত। কিন্তু এখন অবৈধ দখলদাররা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বন ও পাহাড়ি পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, প্রাণবৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে।
“দখলকৃত এলাকা জরিপ করে চিহ্নিত করতে হবে, এনজিও-আইএনজিওর সব কার্যক্রম আইনের আওতায় আনতে হবে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বিকল্প জমিতে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। দখলবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে,” বলে জানান বিশ্লেষকরা।
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ি বনভূমি খোলা হয়েছিল। কয়েক বছরের মধ্যে হাজার হাজার একর বন কেটে আশ্রয়স্থল, বাজার ও দোকানপাট গড়ে ওঠে। সেই সুযোগে বিভিন্ন এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বনভূমিতে অফিস স্থাপন শুরু করে।
এছাড়া উখিয়ার বনাঞ্চলে সংরক্ষিত এলাকাগুলোয় ওয়্যারহাউস, অফিস, পশুখামার নির্মাণ করে স্থানীয়দের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে।
উখিয়া-টেকনাফের বনভূমি শুধু রোহিঙ্গা সংকটের কারণে নয়, এনজিও-আইএনজিও, স্থানীয় সিন্ডিকেটের দখলদারিতেও ধ্বংসের পথে। সরকারি নোটিশ অগ্রাহ্য করে যারা বনভূমি ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। আইন প্রয়োগ না হলে উখিয়ার বনভূমি হারাবে প্রাণবৈচিত্র্য, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
উখিয়ার বনাঞ্চল আজ একদিকে মানবিক ও উন্নয়নমূলক প্রয়োজনে, অন্যদিকে অবৈধ দখল ও সিন্ডিকেটের দাপটে সংকটাপন্ন। বনভূমি রক্ষা ও সরকারের রাজস্ব ও পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।
####

আপনার মতামত লিখুন