টেকনাফে সীমান্তের ওপারে বিমান হামলার পর বাড়ছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা
Rohingya refugees, who crossed the border from Myanmar two days before, walk after they received permission from the Bangladeshi army to continue on to the refugee camps, in Palang Khali, near Cox's Bazar, Bangladesh October 19, 2017. REUTERS/Jorge Silva - RC1F66041E20
বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে বিমান হামলার পর রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল বুধবার রাতের বিমান হামলার পর রাখাইন সীমান্তের ওপারে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও তীব্র হয়েছে।
তারা আরও বলছেন, এরই মধ্যে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসার হামলায় কয়েকজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন।
রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানায়, গতকালের বিমান হামলায় এক নারী ও দুই শিশু আহত হয়।
মংডু ও বুথিডংয়ে বসবাসরত আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে তারা এ তথ্য জানতে পেরেছেন।
টেকনাফের একটি ক্যাম্পের বাসিন্দা কলিমুল্লাহ জানান, তিন দিন আগে পাহাড়ি এলাকায় আরসার একটি দল আরাকান আর্মির কয়েকটি গাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকজন আরাকান আর্মি সদস্য নিহত হন।
তার মতে, এ হামলার পর আরাকান আর্মি স্থানীয় রোহিঙ্গাদের ওপর চাপ তৈরি করছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আরসা ও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলছে আরাকান আর্মি।
কলিমুল্লাহ বলেন, ‘বারবার বিমান হামলার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক চরম আকার ধারণ করেছে। আমরা শুনেছি অনেক রোহিঙ্গা নিরাপদ স্থানে চলে যেতে চাচ্ছেন, কিন্তু আরাকান আর্মি তাদের এলাকা ছাড়তে দিচ্ছে না।’
তিনি আরও জানান, মংডুর আশপাশে বসবাসরত অনেক রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছেন এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে লড়াই ও বিমান হামলা চলতে থাকলে অনেকেই হয়তো বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করবেন।
আরাকান আর্মির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবাল আরাকান নেটওয়ার্ক’ সাম্প্রতিক এ বিমান হামলা নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার দিবাগত রাত ৯টার পর মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দুটি ফাইটার জেট বুথিডংয়ে বোমাবর্ষণ করে। এতে এক রোহিঙ্গা নারী ও দুই শিশু আহত হয়।
সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায়, গত রোববার সকালে, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে এবং বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার পর মংডুর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা এবং আরাকান আর্মির বেশ কয়েকটি অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়।
মংডুর বাসিন্দা এক রোহিঙ্গা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টেলিফোনে জানান, বুধবার দিন ও রাতের বিমান হামলা মংডু শহরের কাছাকাছি এলাকায় চালানো হয়।
তবে বৃহস্পতিবার বিকেলের হামলা রাখাইন রাজ্যের আরও উত্তর দিকে হওয়ায় সীমান্ত থেকে বিস্ফোরণের শব্দ খুব একটা জোরালো শোনা যায়নি বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বুথিডংয়ের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে হামলা চালানো হলেও মংডুতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী মূলত আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা করছে।
বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত তেমন হয়নি।’
‘মানুষ এখনো রাখাইনের ভেতরেই কোনোমতে অস্থায়ী আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করছে। তবে বিমান হামলা ও সংঘর্ষ আরও তীব্র হলে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালানোর চেষ্টা করতে পারে,’ বলেন তিনি।
যোগাযোগ করা হলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, বিমান হামলার শব্দ টেকনাফ থেকেও শোনা গেছে।
তিনি বলেন, ‘যখনই বিমান হামলা হয় সীমান্তের ওপারে বসবাসরতরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আমরা আগে দেখেছি এমন পরিস্থিতিতে অনেক রোহিঙ্গা নাফ নদ পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমরা সর্বোচ্চ সর্তক অবস্থানে রয়েছি।’
বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে থেমে থেমে বিমান হামলা চলছে এবং সন্ধ্যার পর তা আরও তীব্র হয় বলে জানান তিনি।
এই বিজিবি কর্মকর্তা বলেন, ‘বিভিন্ন সূত্রের বরাতে ১৮ থেকে ২৭টি বোমা হামলার কথা জানা গেছে। সংখ্যার তারতম্য থাকলেও এটি স্পষ্ট যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিমান হামলা চালানো হয়েছে। আমরা প্রথম বুধবার সকাল ১০টা ২৪ মিনিটে বিমান হামলার খবর পাই এবং সারাদিন ধরেই এমন খবর আসতে থাকে।’
এদিকে, প্রায় ৭ মাস শান্ত থাকার পর বুধবার রাতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রাখাইন রাজ্যে পুনরায় বিমান হামলা শুরু করলে টেকনাফ সীমান্তের বাসিন্দাদের মধ্যেও তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
রাত সাড়ে ৯টার পরপরই চারটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দে জাদিমুড়া থেকে শাহ পরীর দ্বীপ পর্যন্ত এলাকার ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে, যার ফলে অনেক বাসিন্দা আতঙ্কে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম আনিস চৌধুরী বলেন, ‘মিয়ানমারের ভেতরের বিকট বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ সীমান্ত এলাকায় শোনা যাচ্ছে। আমরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি। সীমান্তের বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।’
# সূত্র : ডেইলি স্টার

আপনার মতামত লিখুন