চকরিয়ায় মায়ের খুনি ছেলে ও দুই পুত্রবধূ!
মেয়েকে জমি লিখে দেওয়ায় মাকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ, ছেলে-পুত্রবধূসহ গ্রেপ্তার ৩
কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার সবুজবাগ আবাসিক এলাকায় ছেলের বাসায় আরফা খাতুন (৭৫) নামে এক বৃদ্ধাকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর ছেলে, দুই পুত্রবধূ ও গৃহকর্মীর বিরুদ্ধে। মেয়েকে ৬৫ কড়া জমি হেবা করে দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হয়ে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার প্রায় চার মাস পর নিহতের নাতি মো. পারভেজ উদ্দিন বাবু (২৯) বাদী হয়ে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করলে ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। মামলার তদন্তে এজাহারভুক্ত চার আসামির সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এরই মধ্যে মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অপর আসামি পলাতক রয়েছেন।
মামলার বাদী পারভেজ উদ্দিন চকরিয়া পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পালাকাটা হাশেম মাস্টার পাড়ার রশিদ আহমদের ছেলে। তিনি নিহত আরফা খাতুনের মেয়ে জান্নাত আরা বেগমের ছেলে।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন—নিহতের ছোট ছেলে আবদুল আজিজ (৩৫), তাঁর স্ত্রী আকলিমা জান্নাত (২৬), নিহতের অপর ছেলে শামসুল আলমের স্ত্রী নাছরিন সোলতানা মুন্না (২৮) এবং বাসার গৃহকর্মী লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের হারগাছা এলাকার জয়নাব বেগম (২২)।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
মামলার এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর বিকেল ৩টা থেকে পরদিন ১১ নভেম্বর সকাল ৬টার মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে চকরিয়া পৌরসভার সবুজবাগ এলাকার হাফেজ টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় ছেলের বাসায় আরফা খাতুনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।
ছুরিকাঘাতে তাঁর পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যায় বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, আরফা খাতুন তাঁর নিজ নামে থাকা ৬৫ কড়া জমি মেয়ে লায়লা বেগমের নামে এককভাবে হেবা করে দেওয়ায় ছেলে ও দুই পুত্রবধূ ক্ষুব্ধ হন। পরে কৌশলে তাঁকে ছেলের বাসায় বেড়াতে এনে কয়েকজন মিলে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।
তবে ঘটনার পর বিষয়টি ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, বৃদ্ধা আরফা খাতুন ছেলেদের বাসায় বেড়াতে এসে আত্মহত্যা করেছেন—এমন কথা প্রচার করে তাঁর মরদেহ দ্রুত গ্রামের বাড়ি চকরিয়া উপজেলার চিরিঙ্গা ইউনিয়নের সওদাগরঘোনায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিনা ময়নাতদন্তে মরদেহ দাফন করা হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে তখন কোনো মামলা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে একপর্যায়ে ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছিল বলে মামলার বাদী দাবি করেন।
নাতির সন্দেহ, আদালতে মামলা
দাদির মৃত্যুর ঘটনাটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে নাতি পারভেজ উদ্দিন বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চারজনের নাম উল্লেখ করে আরও ৩ থেকে ৪ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন তিনি।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক জানান, আদালত বাদীর ফৌজদারি নালিশি মামলা আমলে নিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে চকরিয়া থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন।
পরে চকরিয়া থানা পুলিশ আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে জানায়, আরফা খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় উল্লেখিত সময়ে চকরিয়া থানায় কোনো মামলা, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) কিংবা লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ
মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই আদালতের বিচারক মুহাম্মদ ফারহান সাদিক মামলাটি পুনরায় তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে তদন্তকালে আসামিদের সম্পৃক্ততা প্রতীয়মান হলে তাদের গ্রেপ্তারের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ক্ষমতা দেন আদালত।
মামলার তদন্তভার পান কক্সবাজার পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) রাজীব পোদ্দার।
তদন্তে তিনজন গ্রেপ্তার
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ওমর ফারুকের দাবি, তদন্তকারী কর্মকর্তা বিভিন্ন কৌশলে তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বৃদ্ধা আরফা খাতুন হত্যার ঘটনায় এজাহারভুক্ত চার আসামির সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সত্যতা পান।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ সেপ্টেম্বর এজাহারভুক্ত চার আসামির মধ্যে নাছরিন সোলতানা মুন্না, জয়নাব বেগম ও আবদুল আজিজকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়।
এ সময় মামলার দুই সাক্ষী—নিহতের মেয়ে জান্নাত আরা বেগম ও নিহতের ভাতিজার স্ত্রী হামিদা বেগম—আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। বাদীপক্ষের দাবি, তাঁদের জবানবন্দিতে সম্পত্তির জন্য আরফা খাতুনকে হত্যার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
পরে আদালতের বিচারক মুহাম্মদ ফারহান সাদিক গ্রেপ্তার তিন আসামি—নিহতের ছেলে আবদুল আজিজ, অপর ছেলের স্ত্রী নাছরিন সোলতানা মুন্না এবং গৃহকর্মী জয়নাব বেগমকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পলাতক এক আসামি
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কক্সবাজার পিবিআইয়ের এসআই রাজীব পোদ্দার বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে এজাহারভুক্ত চার আসামির বৃদ্ধা আরফা খাতুন হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার সত্যতা পাওয়া গেছে।’
তিনি বলেন, নিহতের মেয়েসহ দুইজন সাক্ষী আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা আরও বলেন, এজাহারভুক্ত চার আসামির মধ্যে আকলিমা জান্নাত পলাতক রয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া মামলার অধিকতর তদন্তের স্বার্থে গ্রেপ্তার তিন আসামির বিরুদ্ধে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মামলাটি বর্তমানে পিবিআইয়ের তদন্তাধীন। তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও ঘটনার প্রকৃত কারণ আরও স্পষ্ট হবে।

আপনার মতামত লিখুন