* এক দিনের কাজ, ৩০ দিনের বিল * ৪ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত * অভিযুক্তদের গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন * ‘মঞ্জু সিন্ডিকেটে’ তদন্ত প্রভাবিত
একদিনের ক্রেন ভাড়া ৪৬ লাখ! বিসিআইসিতে ‘মঞ্জু সিন্ডিকেট’
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) আওতাধীন আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডে (এএফসিসিএল) এক দিনের জন্য ব্যবহৃত দুটি ক্রেনের বিপরীতে এক মাসের ভাড়া দেখিয়ে প্রায় ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৭৫৬ টাকা পরিশোধের অভিযোগের চার বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ হয়নি। অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তদন্তের আওতায় থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এতে বিসিআইসির অভ্যন্তরে তদন্তের নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
দুর্নীতির অভিযোগটি ঘিরে বিসিআইসি একাধিকবার তদন্ত কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। সর্বশেষ চলতি বছরের ৮ জুন জারি করা এক পুনঃদপ্তর আদেশে বিসিআইসির মহাব্যবস্থাপক সাইফুল আলমকে আহ্বায়ক করে তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। আদেশে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন চিফ পারসোনেল বরাবর জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও প্রায় দেড় মাস পার হয়ে গেলেও প্রতিবেদন জমা হয়নি।
এর আগে ১১ জুন জারি করা তদন্ত নোটিশে দায় নির্ধারণের লক্ষ্যে নয়জন কর্মকর্তাকে তলব করা হয়। তারা হলেন— মহাব্যবস্থাপক মো. মনজুরুল হক, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) আশরাফুল জাকারিয়া, ভারপ্রাপ্ত প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা আবুল কাশেম (রনি), উপ-প্রধান প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোহাম্মদ মোতালেব, ভারপ্রাপ্ত প্রধান রসায়নবিদ মো. রফিক, নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মো. জাহিদ হাসান, নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মো. শফিকুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) জসিম উদ্দিন আহমেদ তুহিন এবং অবসরপ্রাপ্ত রসায়নবিদ মো. তোতাসেম হক।
তদন্তের আওতায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক মো. মনজুরুল হক বর্তমানে বিসিআইসির ৩৪ বাফার গুদাম নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই প্রকল্পে কর্মরত রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল জাকারিয়াও। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প নিয়েও অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্থানীয় ক্রয়াদেশের মাধ্যমে এএফসিসিএলের জন্য ১৫০ মেট্রিক টন ও ৫০ মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ক্রেন ৩০ দিনের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ক্রেন দুটি কারখানায় হস্তান্তরের পর ৩০ দিনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু কারখানার গেট রেজিস্টার এবং সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়, ক্রেন দুটি ২০২২ সালের ২৯ মার্চ সকাল ১০টা ২০ মিনিটে কারখানায় প্রবেশ করে এবং পরদিন ৩০ মার্চ সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে কারখানা ত্যাগ করে। অর্থাৎ বাস্তবে মাত্র এক দিন অবস্থান করলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আলমগীর এন্টারপ্রাইজকে পুরো ৩০ দিনের ভাড়া বাবদ ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৭৫৫ টাকা ৯০ পয়সা পরিশোধ করা হয়।
বিসিআইসির নিরীক্ষা বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবে ক্রেন ব্যবহার না করেই পূর্ণ বিল পরিশোধের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে দায় নির্ধারণ করে বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ নিরীক্ষা বিভাগকে অবহিত করার সুপারিশও করা হয়। তবে সেই সুপারিশের বাস্তবায়ন চার বছরেও হয়নি।
এদিকে তদন্ত দীর্ঘসূত্রতার পেছনে বিসিআইসির অভ্যন্তরে প্রভাবশালী একটি কর্মকর্তা-কেন্দ্রিক বলয় কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিসিআইসির একটি দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, এই প্রভাবের কারণেই তদন্ত বারবার বিলম্বিত হচ্ছে। যদিও এই অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিসিআইসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত মো. মনজুরুল হককে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে উঠেছে, যা অভ্যন্তরীণভাবে ‘মঞ্জু সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত।
তাদের দাবি, তদন্ত কমিটির সদস্যরা নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দিলে প্রভাবশালী মহলের বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কা করছেন। আবার অভিযুক্তদের পক্ষে মত দিলে ভবিষ্যতে আইনি কিংবা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে পারেন— এমন শঙ্কাও রয়েছে। এই দ্বৈত চাপের কারণেই তদন্ত কার্যক্রম বারবার বিলম্বিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
তবে ‘মঞ্জু সিন্ডিকেট’ কিংবা তদন্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সম্পর্কে বিসিআইসির কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও বিসিআইসির মহাব্যবস্থাপক সাইফুল আলম বলেন, আমাদের অফিসের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি এই তদন্তের কাজ করতে হচ্ছে। পূর্বের কমিটির বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতে হচ্ছে, নতুন করে প্রত্যেকের সাক্ষাৎকার নিতে হচ্ছে। কয়েকজনের সাক্ষাৎকার এখনো বাকি আছে। তবে তদন্তের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সহসাই আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেব।
অন্যদিকে বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান বলেন, এই তদন্তের বিষয়ে আমার জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে দেখব কেন তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে না। যদি তদন্তে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চার বছর ধরে ঝুলে থাকা এই তদন্ত শুধু একটি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের নিষ্পত্তির প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি, তদন্তের কার্যকারিতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, নাকি তদন্ত আরও দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে থাকবে— এখন সেই উত্তরই অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন