শবে বরাতে রাসুল সা. যেসব আমল করতেন
শাবান মাস মুমিনের আমলের মাস, শাবান মাস মুমিনের আনন্দের মাস, খুশির মাস। আর এ মাসের ১৪ তারিখের রাত মুসলমানদের অন্যতম একটি রাত। ভারতীয় উপমহাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে এ রাত শবে বরাত নামে পরিচিত। হাদিসের ভাষায় এ রাতকে ‘নিসফ শাবান’ বা শাবান মাসের মধ্যরাত বলা হয়। এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস শরিফে বিবৃত হয়েছে, মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাত অর্থাৎ শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে সৃষ্টির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)
শবে বরাতে রাসুল (সা.) যেসব আমল করতেন
১. পুরো রাত জেগে ইবাদত করতেন। যেমন-নফল নামাজ পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, তাসবিহ পাঠ করা, তওবা-ইস্তেগফার ইত্যাদি পড়া। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেন– পাঁচটি রাত এমন আছে, যে রাতে বান্দার কোনও দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না। আর তা হলো– জুমআর রাতের দোয়া, রজব মাসের প্রথম রাতের দোয়া, নিসফা শাবান তথা অর্ধ শাবানের রাতের দোয়া, ঈদুল ফিতর তথা রোজার ঈদের রাতের দোয়া, ঈদুল আজহা তথা কুরবানির ঈদের রাতের দোয়া। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: ৭৯২৭, সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি: ৬৯৮৭)
২. পুরো শাবান মাসেই অধিক পরিমাণে রোজা রাখা উত্তম। রাসুল (স.) প্রায় পুরো শাবান মাস রোজা রাখতেন। ফাতিমা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলকে (স.) শাবান ও রমযান ছাড়া দুই মাস একাধারে রোজা রাখতে দেখিনি। (সহিহ বুখারি: ১৯৬৯, সহিহ মুসলিম: ১১৫৬)
অন্য হাদিসে বিবৃত হয়েছে, রাসুল (স.) বলেন, যখন শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত আসবে, তখন তোমরা এ রাতে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবে এবং দিনে রোজা পালন করবে। কেননা এই দিন সূর্যাস্তের পরই আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আছো ক্ষমাপ্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো। কে আছো রিজিকপ্রার্থী, আমি তাকে রিজিক দেবো। কে আছো বিপদগ্রস্ত, আমি তাকে বিপদমুক্ত করবো। ফজর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা এ কথা বলতে থাকেন। (ইবন মাজাহ: ১৩৮৮)
৩. কিয়ামুল লাইল: হাদিস শরীফে বিবৃত হয়েছে, আলা ইবনুল হারিস (রা.) থেকে বর্ণিত, আয়েশা (রা.) বলেন, একবার রাসুল (স.) রাতে নামাজে দাঁড়িয়ে এতো দীর্ঘ সময় সেজদায় রইলেন যে, আমার ধারণা হলো হয়ত তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তখন আমি তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিয়ে দেখলাম। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা ওহে হুমাইরা, তোমার কি আশঙ্কা হয়েছে যে, রাসুল (স.) তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, হে রাসুলুল্লাহ আপনার দীর্ঘ সেজদায় আমার আশঙ্কা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কিনা।
রাসুল (স.) জিজ্ঞেস করলেন তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। তখন রাসুল (স.) বললেন, ‘এটা হলো অর্ধ শাবানের রাত অর্থাৎ শাবানের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত। আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তার বান্দার প্রতি মনযোগ দেন এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন, অনুগ্রহ প্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন, বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই। (শুয়াবুল ঈমান: ৩৫৫৪)
সুতরাং এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কিয়ামুল লাইল অর্থাৎ নফল নামাজে দীর্ঘ কিরাত পড়া এবং লম্বা সেজদা করা এ রাতের বিশেষ একটি আমল।
৪. ভিত্তিহীন কাজ পরিহার: হাদিস শরীফে শবে বরাতের রাতে রাসুল (স.) থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে কোনও ইবাদত প্রমাণিত নেই। সাহাবায়ে কেরামদের থেকেও এর কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুতরাং আমাদের সমাজে প্রচলিত শবে বরাতের বিশেষ পদ্ধতির যে নামাজের কথা বলা হয় তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট। এগুলো বিশ্বাস করা এবং এগুলোর ওপর আমল করা কোনোভাবেই জায়েজ নেই।
৫. ক্ষমা প্রার্থনা করা: শবে বরাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করা। কারণ বরকতময় এই রাতে আল্লাহ তাআলা প্রথম আকাশে এসে বান্দাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন। তাদের গুনাহগুলো মাফ করেন। হাদিস শরীফে বিবৃত হয়েছে, রাসুল (স.) বললেন, যখন অর্ধ শাবানের রাত আসে তখন আল্লাহ তাআলা প্রথম আকাশে অবস্থান করে, মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী ছাড়া অন্যদের ক্ষমা করে দেন। (মুসনাদে বাজজার: ৮০)

আপনার মতামত লিখুন