কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভকেন্দ্রিক রেন্ট বাইক ব্যবসাকে ঘিরে ভয়াবহ অনিয়ম, মাসোহারা বাণিজ্য এবং ট্রাফিক পুলিশের যোগসাজশের অভিযোগ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অভিযোগ রয়েছে, “র্যাংকন, কে.এফ,, এইচ.এফ, এফ.এইচ, এইচ.বি,আর, জে.এম, এম, সি, জে.এইচ ও এ” সহ বিভিন্ন নামের বিশেষ টোকেন ব্যবহার করে অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে রেন্ট বাইক। এসব টোকেন ব্যবহারকারী মোটরসাইকেলগুলোকে মাসিক মাসোহারার বিনিময়ে ট্রাফিক পুলিশ কোনো ধরনের কাগজপত্র যাচাই, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মেরিন ড্রাইভ ও পর্যটন জোন জুড়ে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজারের বেশি রেন্ট বাইক চলাচল করছে। এর মধ্যে নিয়মিত মাসোহারা প্রদানকারী বাইকগুলোকে বিশেষ টোকেন সরবরাহ করা হয়। আর এই টোকেনই মূলত পুলিশের চেকপোস্ট পার হওয়ার ‘পাস’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, টোকেনযুক্ত মোটরসাইকেল দেখলে ট্রাফিক সদস্যরা আর কোনো ধরনের কাগজপত্র দেখতে চান না। ফলে রেজিস্ট্রেশনবিহীন, নম্বরপ্লেট বিহীন, চোরাই মোটরসাইকেল, বর্ডার ক্রস মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই এসব দিন-রাত মেরিন ড্রাইভ ও পর্যটন এলাকায় বেপরোয়াভাবে চলাচল করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এফ.এইচ, কে.এফ, এইচ.বি ও এইচ.এফ নামের প্রায় এক হাজার টোকেনের নিয়ন্ত্রণে করছেন ফরহাদ নামের এক যুবক। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই টোকেন বাণিজ্য পরিচালনা করছেন।
একইভাবে “এম” নামের প্রায় ৩ শতাধিক টোকেন পরিচালনা করেন কলাতলি এলাকার এক যুবক। অন্যদিকে সুগন্ধা পয়েন্টস্থ পানসি সড়কের মুখে “জে.এইচ” নামের আরও প্রায় ৫ শতাধিক টোকেন নিয়ন্ত্রণ করেন বাহারছড়া এলাকার মিটুন ও কলাতলির আরিফ নামের দুই যুবক। অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি ট্রাফিক পুলিশের কিছু সদস্যের সহযোগিতায় নতুন করে এই টোকেন লাইন চালু করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিটি টোকেনের বিপরীতে মাসিক নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। আর সেই অর্থের একটি অংশ নিয়মিতভাবে পৌঁছে যায় সংশ্লিষ্ট অসাধু ট্রাফিক সদস্যদের কাছে। ফলে অবৈধ রেন্ট বাইক ব্যবসা বন্ধে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। বরং প্রতিদিন নতুন নতুন টোকেন যুক্ত হয়ে এই সিন্ডিকেট আরও বড় আকার ধারণ করছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কলাতলি মোড়, লাবণী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট, সী-প্যালেস পয়েন্ট, কুটুমবাড়ি পয়েন্ট ও মেরিন ড্রাইভজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী রেন্ট বাইক টার্মিনাল। পর্যটকদের কাছ থেকে শুধু নাম, ফোন নম্বর কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য নিয়েই ঘণ্টাভিত্তিক মোটরসাইকেল ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাড়াটিয়ার ড্রাইভিং লাইসেন্স যাচাই করা হচ্ছে না। এমনকি অনভিজ্ঞ কিংবা লাইসেন্সবিহীন চালকদের হাতেও সহজেই তুলে দেওয়া হচ্ছে উচ্চগতির মোটরসাইকেল।
ঢাকার মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে কক্সবাজার ঘুরতে আসা পর্যটক শওকত আলী জানান, কলাতলি মোড়ের ইউনিভার্সিটির সামনে থেকে ঘণ্টাপ্রতি ৩০০ টাকা চুক্তিতে তেল ছাড়া ৫ ঘণ্টার জন্য একটি মোটরসাইকেল ভাড়া নেন তিনি। কীভাবে বাইক ভাড়া নিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “নাম আর ফোন নম্বর দিয়ে একটি ফরমে সই করেছি, এরপর তারা গাড়িটি বুঝিয়ে দিয়েছে। পরে কলাতলি প্রাইমারি স্কুলের আগের একটি দোকান থেকে ১ হাজার টাকার তেল নিয়েছি।
তাঁর কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি প্রবাস থেকে এসেছি, তিন মাস হলো দেশে। ছুটিতে এসেছি, কয়েকদিন পর আবার চলে যাব। রেন্ট বাইক মালিক লাইসেন্স দেখতে চেয়েছিলেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, না, শুধু একটি হেলমেট দিয়েছে, আর কিছু না।
একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন সুগন্ধা পয়েন্টে মোটরসাইকেল ভাড়া নেওয়া টাঙ্গাইলের দুই যুবক নাহিয়ান ও আব্দুল্লাহ। তারা জানান, ভোটার আইডি কার্ড দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানের একটি প্যাডে সই করে ১ হাজার ২০০ টাকায় ৩ ঘণ্টার জন্য একটি মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়েছেন। অথচ তাদের কারোরই ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। যাত্রাপথে পুলিশ আটক করলে কী করবেন এমন প্রশ্নে তারা বলেন, রেন্ট বাইক মালিক তাদের একটি বিশেষ লোগো বা টোকেন দেখিয়ে দিয়েছেন এবং সেটি দেখাতে বলেছেন। এরপরও সমস্যা হলে মালিক ফোনে পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, লাইসেন্সবিহীন ও অনভিজ্ঞ চালকদের হাতে নির্বিচারে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়ায় মেরিন ড্রাইভ এখন কার্যত দুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে পরিণত হয়েছে। প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। বিশেষ করে পর্যটকদের অনেকেই নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই উচ্চগতিতে বাইক চালাচ্ছেন। এতে করে একদিকে যেমন প্রাণহানি বাড়ছে, অন্যদিকে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ট্রাফিক সদস্যের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও মাসোহারা বাণিজ্যের কারণেই এই টোকেনভিত্তিক সিন্ডিকেট দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে জড়িত রেন্ট বাইক ব্যবসায়ী, টোকেন নিয়ন্ত্রক এবং অভিযুক্ত ট্রাফিক সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কক্সবাজারের পর্যটন খাত ও সড়ক নিরাপত্তা দুটোই বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
মাসোহারার বিষয়ে কোন ট্রাফিক কর্মকর্তা জড়িত থাকার প্রমাণ থাকলে পুলিশ সুপারকে অবগত করার জন্য বলে দায় এড়িয়ে যান কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন।
জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান বলেন, ট্রাফিক পুলিশের মাসোহারার বিষয়টি আমার জানা নেই।সুনির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে যদি কেউ অভিযোগ করে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আপনার মতামত লিখুন