বাদী জানেন না আসামি কারা, ঘটনা কী
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত বিজয়ের দিন ৫ আগস্ট কুমিল্লার ময়নামতি এলাকায় মামুন আহমেদ রাফসান (১৮) নামে এক হোটেল কর্মচারী নিহত হন। তিনি হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মরিয়াত ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামের ছালেক মিয়ার ছেলে। এ ঘটনার প্রায় ৯ মাস পর গত ২৮ মে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে পুলিশ নিহত রাফসানের বড় ভাই রানু মিয়াকে কুমিল্লায় এনে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করায়। ওই মামলায় সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্যসহ ১৪৭ জনকে আসামি করা হয়। তবে মামলার বাদী ১৭ জুলাই সমকালকে বলেছেন, তিনি মামলার কোনো আসামিকেই চেনেন না। সমন্বয়কদের উপস্থিতিতে পুলিশ স্বাক্ষর দিতে বলেছে। এর বেশি কিছু তিনি জানেন না।
অভিযোগ উঠেছে, জুলাই আন্দোলনে কুমিল্লার অধিকাংশ মামলারই এমন অভিন্ন চিত্র। অনেক মামলায় ঢালাও আসামি থাকায় অধিকাংশ মামলার বাদী আসামি চেনেন না, জানেন না ঘটনার বিবরণ। তদন্তে পাওয়া যাচ্ছে না যথাযথ সাক্ষী। আবার এসব মামলা বাণিজ্যের সঙ্গে পুলিশ ও সমন্বয়করাও জড়িত। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে প্রতিবেদক। কর্মকর্তারা মামলার এসব অসংগতি তুলে ধরে বলেছেন, মামলাগুলোর তদন্তে বলার মতো বড় কোনো অগ্রগতি নেই।
পুলিশের তথ্যমতে, জুলাই আন্দোলনে জেলার ১১টি থানায় ১২টি হত্যা, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য অভিযোগে ৩০টিসহ ৪২টি মামলা হয়েছে। যার একটির চার্জশিটও দিতে পারেনি পুলিশ। এখনও ময়নাতদন্ত হয়নি চারটি মরদেহের।
জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ছাত্র আন্দোলন চলাকালে জেলার কোতোয়ালি মডেল থানায় সর্বাধিক ১৮টি মামলা হয়। ৪২ মামলায় এজাহার নামীয় আসামি চার হাজার ৪২৪ ও অজ্ঞাতনামা আসামি ছয় হাজার ৩৯২ জন। এসব মামলায় বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হন এজাহার নামীয় ৩২৮ জন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬৯১ জন।
মামলায় যত অসংগতি
গত বছরের ১৪ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গণঅভ্যুত্থানের মামলায় ঢালাও আসামি করার বিষয়ে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। এর পরও কুমিল্লায় থামছে না ঢালাও আসামি করার রেকর্ড। গত ২৮ মে ময়নামতিতে নিহত রাফসানের বড় ভাই রানু মিয়াকে কুমিল্লায় এনে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করা হয়। এতে সাবেক এমপি বাহাউদ্দিন বাহার ও তাঁর মেয়ে সাবেক সিটি মেয়র তাহসিন বাহার সূচনাসহ ১৪৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এ মামলার এজাহার পর্যালোচনায় দেখা যায়, এতে কোতোয়ালি, সদর দক্ষিণ, বুড়িচং, মনোহরগঞ্জ, চান্দিনা, দেবিদ্বার, মুরাদনগর ও চৌদ্দগ্রাম থানা এলাকার দলীয় লোকজন ছাড়াও সাধারণ মানুষকেও আসামি করা হয়েছে।
তবে বাদী রানু মিয়া সমকালকে বলেন, কারা আমার ভাইকে মেরেছে জানি না। এখন মিডিয়ায় আমার বিরুদ্ধে মামলা বাণিজ্যের কথা হচ্ছে। আমি কারও কাছ থেকে কোনো টাকা নিইনি।
৪ আগস্ট আন্দোলনের সময় দেবিদ্বার উপজেলা সদরে গুলিতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আবদুর রাজ্জাক রুবেল (৩৫)। ২০ আগস্ট স্থানীয় বিএনপি নেতা আবুল কাসেম আদালতে মামলা করেন। আসামি সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদসহ ৭০ জন। একই ঘটনায় পরদিন থানায় আরেকটি মামলা করেন নিহতের মা হোসনে আরা বেগম। সেখানেও আসামি সাবেক এমপিসহ ৭০ জন। দুটি মামলাই থানায় এফআইআর করা হয়।
রুবেল হত্যা মামলার বাদী পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাসেম বলেন, রুবেলের পরিবার প্রথমে একটি চক্রের দ্বারা মামলা করতে বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। এতে দলের নির্দেশে প্রথম আদালতে মামলার আবেদন করি, আদালতের নির্দেশে থানায় মামলা রেকর্ড হয়। কিন্তু পরদিন তাঁর পরিবার আরও একটি মামলা করে।
রুবেলের স্ত্রী হ্যাপী আক্তার ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, আমার স্বামীকে যারা প্রকাশ্যে হত্যা করেছে, তারা জামিনে বের হয়ে এলাকায় ঘুরছে। তাহলে কি আমি কোনো দিনও স্বামী হত্যার বিচার পাব না?
এদিকে ঢালাও তালিকা করে আসামি করায় জেলার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ২ অক্টোবরের একটি মামলায় বাদ যাননি মৃত আওয়ামী লীগ নেতারাও। মামলার বাদী কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র এমরান হোসেন। তিনি ভোলা সদর থানার শাহামাদার গ্রামের শাহাজানের ছেলে। ৯৬ আসামির মধ্যে আওয়ামী লীগের তিন প্রয়াত নেতা রয়েছেন। তারা হলেন– উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক কৃষিবিষয়ক সম্পাদক কামাল উদ্দিন মজুমদার, সাবেক বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক আবদুল মমিন এবং পূর্ব জোড়কানন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ওয়াহিদুর রহমান ফরিদ। তবে পুলিশ জানিয়েছে, চার্জশিট থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হবে।
এ মামলার বাদী এমরান বলেন, মামলার অভিযোগ ঠিক আছে। তবে শুরুতে আসামিদের নাম শনাক্তে ভুল হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, অনেক মামলার বাদী আসামিই চেনেন না। অভিযোগ উঠেছে, মামলা বাণিজ্যে আর্থিক সুবিধা হাতিয়ে নিতে অন্যরা ইচ্ছামতো লোকজনকে আসামি করেছেন। একই সময়ে একই ব্যক্তিকে ভিন্ন জেলায় মামলার আসামি করা, ব্যক্তিগত, পেশাগত ও ব্যবসায়িক বিরোধে আসামি করায় তদন্তে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
গত বছরের ১২ আগস্ট রাতে জেলায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হত্যার প্রথম মামলা হয়। ৪ আগস্ট মাছুম মিয়া (২২) নামের এক হোটেল কর্মচারীকে হত্যার অভিযোগে সাবেক এমপি বাহারসহ ৬২ জনের নামে মামলা হয়। এ মামলার বাদী পরিবারের কেউ নন, সদর দক্ষিণ উপজেলার দিশাবন্দ এলাকার ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুল হান্নান। তিনি বলেন, মাছুমের পরিবার তাঁর পাশের গ্রামের বাসিন্দা। তাই প্রতিবেশী হিসেবে মামলা করা, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়।
মাছুমের বাবা শাহীন মিয়া বলেন, ঘটনার পর ভয়ে মামলা করিনি, তখন বিএনপি নেতারা মামলা করেন, আমি থানায়ও যাইনি। আসামি কারা তা আমি পরে জেনেছি এবং সাক্ষ্য দিয়েছি।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুমিল্লা মহানগরীর আহ্বায়ক আবু রায়হান বলেন, জুলাই আন্দোলনে যারা হতাহত হয়েছেন, এসব পরিবারকে আমরা আইনগত সুবিধা দিতে সহায়তা করছি। কোনো মামলায় কাউকে আসামি করা কিংবা বাদ দেওয়ায় তদবির করি না। কিন্তু কিছু সুবিধাবাদী লোক আমাদের নাম ভাঙিয়ে ভুক্তভোগী কিংবা দুর্নীতিবাজ লোকজনের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছে।
কুমিল্লার আদালতের পিপি কাইমুল হক বলেন, সম্প্রতি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না পেলেও যেন কারও বিচারের পথে বাধা না হয়। এ ছাড়া ভয়ে কেউ সাক্ষ্য না দিলেও তদন্ত কর্মকর্তারা ছবি, ভিডিও এবং পারিপার্শ্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে চার্জশিট দিতে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক কুমিল্লার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান বলেন, জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের প্রতিটি মামলারই যেন যথাযথ তদন্ত ও দ্রুত বিচার হয়, আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে এ দাবি করে আসছি। তবে ঢালাও কোনো মামলায় যেন নিরপরাধ কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী করে হয়রানি কিংবা শাস্তি না দেওয়া হয়, সরকার ও তদন্ত সংস্থাকে এ বিষয়টি কঠোরভাবে দেখতে হবে।
কুমিল্লার এসপি নাজির আহমেদ খান বলেন, গুরুত্ব দিয়ে জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের প্রতিটি মামলা তদন্ত করা হচ্ছে। এখনও কোনো মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়নি। নিরপরাধ কেউ যেন মামলায় চার্জশিটভুক্ত না হয়, সেই বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা আছে। আমরাও যথাযথভাবে বিষয়টি দেখছি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ না করে কিংবা অপরাধে সম্পৃক্ত না থেকেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলায় তাকে আসামি করা হয়, তবে সেটা তার প্রতি নিপীড়নমূলক আচরণ হিসেবে গণ্য হবে। আমরা বিগত দিনে দেখেছি গায়েবি মামলার মতো ঘটনা। কোনো ব্যক্তিকে হয়রানি করার অধিকার কারও নেই। সুত্র: সমকাল

আপনার মতামত লিখুন