কক্সবাজারে স্থায়ী সংরক্ষণাগার স্থাপনের উদ্যোগ
লবণ আমদানির অজুহাত আর নয়’ প্রান্তিক চাষির স্বার্থ সুরক্ষায় কঠোর অবস্থানে শিল্প মন্ত্রণালয়
দেশের লবণ শিল্প নতুন এক অধ্যায়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকট ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে চলা এ খাতে এবার সরকারের নজর পড়েছে বাস্তব সমস্যার মূল কেন্দ্রে—প্রান্তিক লবণচাষি ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায়।
শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কক্সবাজারে একটি আধুনিক ও স্থায়ী লবণ সংরক্ষণাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে উৎপাদিত লবণ সারা বছর সংরক্ষণ করা যাবে, যা প্রান্তিক চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করবে এবং দেশের লবণ স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে আরও সুসংহত করবে।
বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ লবণ উৎপাদিত হয় কক্সবাজারে—বিশেষ করে চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, টেকনাফ ও সদর উপজেলার উপকূলজুড়ে বিস্তৃত লবণক্ষেতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই লবণচাষিরা বছরের অর্ধেক সময় রোদে পুড়ে, কাদায় মিশে পরিশ্রম করলেও মৌসুম শেষে ন্যায্যমূল্য পান না। সংরক্ষণাগারের অভাবে বাধ্য হয়ে লবণ বিক্রি করতে হয় কম দামে।
চাষিদের অভিযোগ, মিল মালিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে বছরের পরিশ্রম অনেক সময় লোকসানে শেষ হয়।
চকরিয়ার একজন প্রবীণ লবণচাষি নুরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন,“লবণ তুলি আমরা, কিন্তু দাম ঠিক করে শহরের অফিসে বসে যারা, তারা। একবার সংরক্ষণাগার হলে আমরা অন্তত নিজের লবণ নিজের দামে বিক্রি করতে পারব।”
একই কথা বলেছেন, মহেশখারীর লবণ চাষি আনোয়ার হোসেন।তিনি বলেন চাষিরা লবণ চাষ করলেও লাভের মুখ দেখছে না। মধ্যখানে মিল মালিকদের সিন্ডিকেট ও দালাল মাফিয়া চক্র ব্যবসায় লাভবান হচ্ছে। এ ছাড়াও পর্যাপ্ত লবণ মজুদ থাকার পর লবণ আমদানি করে দেশের লবণ শিল্প ধবংস করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তার।
কোনো অজুহাতে লবণ আমদানি নয়:
মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) সকালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের শহীদ এ টি এম জাফর আলম সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসন ও বিসিকের আয়োজনে অনুষ্ঠিত বার্ষিক পর্যালোচনা সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন,“বাংলাদেশ লবণ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কোনো অজুহাতে খাবার লবণ আমদানি করতে দেওয়া হবে না। সরকারের কঠোর অবস্থান আছে এ বিষয়ে।”
সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান। উপস্থিত ছিলেন বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নিজামউদ্দিন আহমেদ, সরকারি কর্মকর্তা, মিল মালিক ও প্রান্তিক চাষি সমিতির নেতারা।সভায় বর্তমান মজুত, উৎপাদন ব্যয়, ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন সংকট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
সংরক্ষণাগার হলে বদলে যাবে পুরো চিত্র:
কক্সবাজারের লবণ শিল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো — সংরক্ষণ অবকাঠামোর অভাব। লবণ মৌসুম শেষ হওয়ার পর বৃষ্টিতে, বাতাসে, কিংবা জায়গা সংকটে প্রচুর লবণ নষ্ট হয়ে যায়।
শিল্প সচিব সভায় জানান,“যদি উপযুক্ত জমি পাওয়া যায়, কক্সবাজারেই একটি আধুনিক লবণ সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হবে। এর মাধ্যমে উৎপাদিত লবণ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যাবে, দাম ওঠানামা কমবে, এবং চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংরক্ষণাগার হলে লবণ উৎপাদনশীলতা বাড়বে অন্তত ২০ শতাংশ, এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য কমবে।
সভায় আলোচনায় উঠে আসে, কক্সবাজার থেকে বিভিন্ন জেলায় লবণ পরিবহনের সময় মহাসড়কে লবণপানি পড়ে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। সচিব বলেন,
“এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। আমরা পরিবহন ব্যবস্থায় প্যাকেজিং ও ঢাকনা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করব, যাতে সড়কে লবণপানি না পড়ে দুর্ঘটনা না ঘটে।”
সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে লবণনীতি চূড়ান্তের পথে:
বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বলেন,
“লবণ শুধু কৃষিপণ্য নয়, এটি একটি শিল্প উপাদান। তাই এর জন্য আলাদা ‘জাতীয় লবণনীতি’ প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যাতে উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন—সব পর্যায়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকে।”জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন,“কক্সবাজারের অর্থনীতি লবণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। চাষিদের টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসন এ শিল্পে স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা আনতে সচেষ্ট।”
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়। এর ৯০ শতাংশই কক্সবাজারে। কিন্তু বাজারে চাহিদা অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ না হওয়ায় প্রায়ই দেখা দেয় কৃত্রিম সংকট বা মূল্যহ্রাসের ধাক্কা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সংরক্ষণাগার স্থাপন, মিল আধুনিকায়ন, ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন হলে এই শিল্প শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং রপ্তানিযোগ্য খাতে পরিণত হতে পারে।তবে তারা সতর্ক করেছেন— সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন যেন মাঠপর্যায়ের চাষিদের বাস্তব উপকারে আসে, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে না পড়ে।
চাষিদের প্রত্যাশা : ঘোষণার পর এবার বাস্তবায়নের দাবি:
সভা শেষে প্রান্তিক লবণচাষি রশিদা বেগম বলেন,
“আমরা অনেক সভা, অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছি। কিন্তু মাঠে পরিবর্তন আসেনি। এইবার যদি সংরক্ষণাগার হয়, তাহলে হয়তো আমাদের সন্তানরাও এই পেশায় থাকতে চাইবে।”চাষিদের এমন প্রত্যাশার মাঝেই কক্সবাজারের লবণক্ষেত যেন নতুন আশার আলোয় ভেসে উঠছে।
সরকারের ঘোষিত উদ্যোগ যদি দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের লবণ শিল্প নতুন দিগন্তে প্রবেশ করবে—যেখানে চাষির ঘামের দাম ফিরবে, আর ‘লবণ আমদানির অজুহাত’ হয়ে উঠবে অতীত ইতিহাস।

আপনার মতামত লিখুন