‘হাসপাতালে রেফারের কথা বলে কারাগারে, ইফতারের পানিটুকুও দেয়নি পুলিশ’
‘আমি এবং আমার মেয়েকে পুলিশ প্রচণ্ড মারধর করে। মারধরের পর থানায় ইউএনও স্যার আসেন। আমরা তখন মনে করেছিলেন ইউএনও স্যার আমাদেরকে রক্ষা করতে এসেছেন। কিন্তু ওনি আমাদেরকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখার পরও কিছু না বলে উপরে চলে যান। আমরা অনেক অনুরোধ করেছিলাম আমাদেরকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু শুনেন নি। এরপর পুলিশ আমাদেরকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রেফারের কথা বলে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। নেয়ার পথে ইফতারের সময় হলে পানির জন্য অনেক আকুতি মিনতি করি, কিন্তু পানিও দেয়নি। অথচ ইফতারের জন্য তাদের হাতে ফ্রুটিকা ছিলো। আমাদেরকে ইফতারটাও করতে দেয়নি। পরে হাসপাতালের কথা বলে কারাগারে ঢুকিয়ে দেয়। আমাদের শারীরিক আঘাতের অবস্থা দেখে কারা কর্তৃপক্ষ প্রথমে গ্রহণ করতে চায়নি। পরে ইউএনও ফোন করায় কারা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে।’
ঘুষের টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে মারধরের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সাজা দেয়া হয়েছিলো পেকুয়ার রেহেনা মোস্তফা রানু (৩৮) ও তার মেয়ে কলেজ শিক্ষার্থী জুবাইদা জান্নাতকে (২৩)। বিতর্কের মুখে শনিবার (৭ মার্চ) সেই মামলা থেকে খালাস দেয় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। মুক্তি পেয়ে শনিবার রাতে চ্যানেল 24-কে পুলিশের বিরুদ্ধে ভয়াবহ নির্যাতন ও ইউএনও’র বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অপব্যবহারের এভাবেই বর্ণনা দেন ভুক্তভোগী রেহেনা আক্তার।
রেহেনা ও তার মেয়ে জুবাইদার শরীরের বেশিরভাগ অংশে আঘাতের চিহ্ন। মুক্তির পর দ্রুত তাদেরকে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে কথা হয় রেহেনার সঙ্গে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মেয়ে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছেন না।
জানা গেছে, জুবাইদার জন্মের পর রেহেনা ও তার স্বামীর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর ২০১৩ সালে জুবাইদার বাবার মৃত্যু হলে সম্পত্তির ভাগের জন্য চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। কিন্তু তারা সম্পত্তির ভাগ থেকে বঞ্চিত করার জন্য জুবাইদাকে অস্বীকার করা শুরু করেন। সবদিকে দৌড়াদৌড়ির পর ক্লান্ত জুবাইদা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। আদালত মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয় পেকুয়া থানাকে। পেকুয়া থানা থেকে মামলার তদন্তভার যায় এসআই পল্লবের কাছে। এসআই পল্লব প্রতিবেদন দিতে খরচাপাতির দরকার আছে জানিয়ে জুবাইদার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেয়। ঘুষ নেয়ার পরও জুবাইদার চাচাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মিথ্যা প্রতিবেদন দেন বলে অভিযোগ তাদের।
জানা গেছে, ভুল প্রতিবেদন দেয়ায় জুবাইদা এসআই পল্লবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনভাবেই সাড়া না পাওয়ায় গত বুধবার বিকেলে পেকুয়া থানায় গিয়ে এসআই পল্লবের কাছ থেকে ঘুষের টাকা ফেরত চান। এতেই বাঁধে বিপত্তি। শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। এক পর্যায়ে জুবাইদা ও তার মা রেহেনাকে মারধর শুরু করেন। মেরে রক্তাক্ত করার পর ইউএনওকে ডেকে পাঠান পেকুয়া থানার ওসি খাইরুল আলম। ইউএনও’র সামনে ঘটনা না ঘটা স্বত্বেও পুলিশের উপর হামলার অভিযোগ তুলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মা-মেয়েকে এক মাসের সাজা দেন। পরে বিতর্কের মুখে শনিবার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সেই মামলা খারিজ করে মা-মেয়েকে খালাস দেন। এরপর মুক্তি পান তারা।
শুক্রবার মুঠোফোনে ইউএনও মাহবু আলম জানিয়েছিলেন, থানার ভেতর তার (ইউএনও) সামনে পুলিশের উপর হামলা করায় তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেন। সাজার বিষয়ে অভিযুক্তদের (মা-মেয়ে) সামনাসামনি জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর জুবাইদার মায়ের অভিযোগ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না, তাদের সামনে বিচারিক কার্যক্রম হয়নি। কক্সবাজার পৌঁছে কারাগারে প্রবেশের সময় জানতে পারেন তাদেরকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেয়া হয়েছে।
তবে ঘটনার পর থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী জুবাইদা ও তার মা পুলিশের উপর হামলা করেছে। শারীরিকভাবে আঘাত করেছে। থানার ভেতর ঢুকে শারীরিকভাবে আঘাত করার ঘটনায় ফৌজধারী আইনে মামলা করে পুলিশ তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে পারতো। কিন্তু সেটা না করে পুলিশের উপর হামলা দেখিয়ে ইউএনওকে ব্যবহার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেন, যা সত্যিই উদ্বেগজনক। অতীতে পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেয়া হয়েছে এমন ঘটনার নজির খুব কম। তাদের সন্দেহ, ঘুষ আদায় ও মা-মেয়েকে থানার ভেতর নির্যাতনের ঘটনা আড়াল করতে ইউএনও’কে ব্যবহার করে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে ইউএনও, ওসি ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তি দাবি করেন তারা।
এদিকে মা-মেয়েকে নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে পেকুয়া থানার ওসির সঙ্গে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেন নি। শুক্রবার ফোনে কথা বললেও শনিবার ফোন ধরেন নি অভিযুক্ত ইউএনও মাহবুব আলম।

আপনার মতামত লিখুন