কক্সবাজারে হুহু করে বাড়ছে হামের রোগী, সুস্থ থাকতে যা করতে বললেন চিকিৎসকরা
কক্সবাজারে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। সোমবার (একদিনে) কক্সবাজার সদর হাসপাতাল-এ ভর্তি হয়েছে ৩০ জন শিশু। পাশাপাশি একটি বেসরকারি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে আরও ৫ জন আক্রান্ত শিশু।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শুরুতে সাধারণ জ্বর ও কাশি মনে হলেও পরে পরীক্ষা করে অনেক শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হচ্ছে। এতে করে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
রামু উপজেলার মিঠাছড়ির বাসিন্দা মরিয়ম বেগম জানান, ঈদের পরদিন থেকেই তার যমজ দুই শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ করছেন। প্রথমে সাধারণ অসুস্থতা মনে হলেও এক সপ্তাহ পর পরীক্ষায় ধরা পড়ে তারা হাম আক্রান্ত। বর্তমানে তারা কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন মহেশখালীর শাপলাপুরের রুমা আক্তার ও শহরের শাহীনুর আক্তার। তাদের শিশুরাও জ্বরের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর হাম শনাক্ত হয়েছে। সন্তানদের সুস্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন সময় পার করছেন এসব পরিবার।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। বিশেষ করে মহেশখালী, হোয়াইক্যং, মিঠাছড়ি এবং শহরের কালুরদোকান, পাহাড়তলী ও রুমালিয়ারছড়া এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে চালু করা হয়েছে একটি ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’। সেখানে আলাদা করে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।
শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল আলম জানান, আক্রান্তদের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভিটামিন-এ-এর ঘাটতি হামের ঝুঁকি বাড়ায় এবং এটি অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়া জরুরি।
এদিকে জেলার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীর জানান, ইতোমধ্যে জেলায় ৫৩ জন শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জেলায় প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত টিকা মজুত রয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। শিশুদের জ্বর, ফুসকুড়ি বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
হামের লক্ষণ ও প্রতিকার
হাম একটি ভাইরাসজনিত অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা মূলত কাশি, হাঁচি এবং বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৯০ লাখ মানুষ হাম আক্রান্ত হয়। এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
উচ্চ মাত্রায় জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি এর প্রধান লক্ষণ।
ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ১০ থেকে ১৪ দিন পর হামের লক্ষণ শুরু হয়। প্রথমে ১০৩ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং গাল বা মুখের ভেতর ছোট সাদা দাগ (কপলিক স্পট) দেখা দিতে পারে।
এরপর ৩-৪ দিনের মাথায় মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে।
ফুসকুড়ি ওঠার ৪ দিন আগে থেকে ৪-৫ দিন পরে পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে এ রোগ।
সঠিক চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), কানে সংক্রমণ বা মারাত্মক পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
হামের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, তবে উপসর্গ কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ, প্রচুর পানি/তরল খাবার এবং ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়।
সঠিক সময়ে এমএমআর টিকা নেওয়াই এ রোগ প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায়। শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ এমআর/এমএমআর টিকা দিতে হয়।
হাম হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা ঘরে রাখতে (আইসোলেশন), প্রচুর পানি ও তরল জাতীয় খাবার খাওয়াতে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়।
কী করণীয়?
ডা. মুশতাক হোসেন বলছেন, শুধু টিকা নয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণেও বাড়তি ব্যবস্থা দরকার।
“হাম আক্রান্ত শিশুদের ঘরে রাখতে হবে, স্কুলে বা বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না। কারণ এই রোগ হাঁচি-কাশি ও নিঃশ্বাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়াতে পারে।”
ডা. মুশতাক বলেন, দরিদ্র পরিবারের শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে আছে। তাদের জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে আলাদা সেবা বা আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে মা ও শিশু একসঙ্গে থেকে চিকিৎসা ও পরিচর্যা পেতে পারে।
“দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা না দিলে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা কঠিন হবে। এজন্য খাবার, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থাও জরুরি।”
তার ভাষায়, টিকার দ্রুত ব্যবস্থা করা এবং আক্রান্ত শিশুদের কমিউনিটি পর্যায়ে শনাক্ত ও আলাদা রাখার উদ্যোগ একসঙ্গে নেওয়া গেলে সংক্রমণ কমানো সম্ভব হবে।

আপনার মতামত লিখুন