রামুতে ইজারার আড়ালে মানুষের জমির মাটি লুট বালু দস্যুদের: এমপি কাজলের হস্তক্ষেপ কামনা
কক্সবাজারের রামু উপজেলায় বালুমহালের ইজারাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাতের আঁধারে ব্যক্তি মালিকানাধীন খতিয়ানভুক্ত জমির মাটি কেটে বিক্রির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে একদল প্রভাবশালী বালু দস্যুদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে, রাতের আঁধারে স্কেভেটর দিয়ে গভীর করে মাটি কেটে বিক্রি করছে একদল প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ী। ভুক্তভোগীরা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও প্রতিকার মিলছে না। ফলে জমির মালিকরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, রামুর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের শ্রীকুল এলাকায় বাঁকখালী খালের পশ্চিম পাড়সংলগ্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে প্রায় ১৫ ফুট গভীর করে দীর্ঘ প্রায় ৩০০ মিটার এলাকাজুড়ে মাটি কেটে নেয়া হয়েছে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকা ঢালু হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, আগামী বর্ষায় নদীর স্রোতের তোড়ে এসব জমি ধসে নদীতে তলিয়ে যেতে পারে।
ভুক্তভোগী জমির মালিক গিয়াস উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, শ্রীকুল মৌজার ১৮১ খতিয়ানে ৪ একর এবং ১৯ খতিয়ানে ১ একর ৫৪ শতক সর্বমোট ৫ একর ৫৪ শতক জমি আমাদের ওয়ারিশি জমি।
খালের চর থেকে আমার জমি প্রায় ১৫ ফুট উঁচু ছিল। আমার জমির মাটি কেটে নিয়ে যাবে এমন তথ্যের ভিত্তিতে আমি আগে থেকেই ইজারাদার মো. আলম ও তার সহযোগী হারুন অর রশিদ সুমনের কাছে গিয়ে অনুনয় বিনয় করে অনুরোধ করেছি, যেন আমার জমির মাটি না কাটে। কিন্তু তারা আমার অনুরোধ উপেক্ষা করে রাতের আঁধারে প্রায় ২০ শতক জমির মাটি কেটে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। এতে অন্তত এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, দিনের বেলায় মাটি কাটার খবর পেয়ে তিনি রামু উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বশর বাবুর শরণাপন্ন হন। পরে তিনি অভিযুক্তদের ফোন করে কাজ বন্ধ করতে বললে সাময়িকভাবে তা বন্ধ হয়। কিন্তু রাতের আঁধারে আবারও মাটি কেটে নেয়া হয়।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী গিয়াস উদ্দিন কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল-এর কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর সংসদ সদস্য বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নির্দেশ দেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্দেশনার পরও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে মাটি দস্যুরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বাঁকখালী নদীর শ্রীকুল মৌজার ১৪টি দাগে মোট ৬ দশমিক ৯৫ একর (প্রায় ১৭ কানি) চরাঞ্চল থেকে পলি অপসারণের অনুমতি রয়েছে। অথচ বাস্তবে অভিযুক্তরা প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কানি এলাকাজুড়ে মাটি কাটার কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা অনুমোদনের সীমা বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইতিপূর্বে ড্রেজার বসিয়ে বাঁকখালী নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করা হয়। এতে নদীর পূর্ব পাড়ের রাজারকুল অংশে তীরভাঙন দেখা দেয়, সরে যায় তীররক্ষা ব্লক, এমনকি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় কয়েকটি অংশ। অথচ প্রচলিত আইন অনুযায়ী নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অভিযোগ রয়েছে, ইজারার অজুহাতে সংশ্লিষ্টরা স্থানীয় প্রশাসনকে প্রভাবিত করে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
আইনজীবী শিপ্ত বড়ুয়া জানান, গুটিকয়েক বালু দস্যুর অবৈধ অর্থ আয়ের খেসারত দিতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে ব্যক্তি জমি হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত কোটি কোটি টাকার বেড়িবাঁধ ও তীররক্ষা ব্লক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে ইজারার নামে পরিবেশ ধ্বংস, ব্যক্তি সম্পত্তি লুট আর সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি আর কতদিন চলবে? প্রশাসন কি নীরব দর্শক হয়েই থাকবে?
জানতে চাইলে অভিযুক্ত হারুন অর রশিদ সুমন বলেন, সরকারি তহসিল অফিস কর্তৃক জমি পরিমাপ করে তাদেরকে জমি চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। তারা সেই অনুযায়ী মাটি কেটেছেন বলে জানান।
জানতে চাইলে রামু উপজেলা-র অ্যাসিল্যান্ড (ভূমি) জানান, ব্যক্তিমালিকানাধীন খতিয়ানভুক্ত জমি থেকে মাটি কাটার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি নিলামের নির্দেশনা অনুযায়ী কেবল ইজারাদাররা মাটি উত্তোলন করতে পারবেন। ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান।

আপনার মতামত লিখুন