উদীচীর নাটক ‘ভূমিসূত্র’: মানুষের নীরব প্রতিরোধ
আইন, নিষেধাজ্ঞা আর ক্ষমতার অদৃশ্য দেয়ালের বিপরীতে মানুষের টিকে থাকার লড়াই—এই দ্বন্দ্বই কাব্যিক ভাষায় মঞ্চে তুলে ধরেছে নাটক ‘ভূমিসূত্র’।
শনিবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরির শহীদ সুভাষ হলে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কক্সবাজার জেলা সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত চার মাসব্যাপী প্রযোজনাভিত্তিক নাট্য কর্মশালার সমাপ্তি প্রযোজনা ছিল এটি।
প্রায় অর্ধশতাধিক প্রশিক্ষণার্থীর অংশগ্রহণে নাটকটি মঞ্চে আসে। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন ইমরান হোসেন ইমু। সংগীত পরিচালনা করেন রিদিতা মায়িশা।
নির্দেশক ইমরান হোসেন ইমু বলেন, ‘ভূমিসূত্র’ শুধু জমির সংকটের গল্প নয়। এটি মানুষের শিকড়, লোভ, অহংকার আর স্বপ্নের টানাপোড়েনের প্রতিচ্ছবি। এই নাটকে মাটি নিজেই কথা বলে—তার বুকে জমে থাকে শোষণ, প্রতিরোধ আর অসহায়তার ইতিহাস।’
তিনি আরও বলেন, নাটকের প্রতিটি চরিত্র বাস্তব জীবনের প্রতিনিধিত্ব করে। কোরাসকে ‘মাটির আত্মা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে—যারা ঘটনার নীরব সাক্ষী, ইতিহাসের ধারক এবং ভবিষ্যতের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা বহন করে।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কক্সবাজার জেলা সংসদের সভাপতি আশুতোষ রুদ্র বলেন, এই প্রযোজনা তাদের দীর্ঘমেয়াদি নাট্যচর্চার অংশ। কর্মশালার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে মঞ্চনাটকের ভাষা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সাধারণ সম্পাদক সৌরভ দেব বলেন, উদীচী সবসময় মানুষের কথা বলে। ‘ভূমিসূত্র’ সেই ধারাবাহিকতারই একটি শিল্পিত প্রতিবাদ।
‘ভূমিসূত্র’ একটি রাজনৈতিক-মানবিক নাটক। এখানে জমি কেবল সম্পদ নয়, ক্ষমতার উৎস। গ্রামের কৃষকেরা যখন জীবিকার জন্য মাঠে নামতে চায়, তখন তাদের সামনে দাঁড়ায় আইন, নিষেধাজ্ঞা ও অন্যায়ের কাঠামো। ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে সহমর্মিতা, নিঃশব্দে জমে ওঠে ক্ষোভ।
নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র অরুপ কবিয়াল—লোকগান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করা এক শিল্পী। দীর্ঘদিনের দখলদারি ও ক্ষমতার চক্রে তার পরিবার ও আশপাশের মানুষ ক্রমে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। একই সময়ে সংবাদমাধ্যম সত্য আড়াল করে ‘উন্নয়নের গল্প’ তুলে ধরে। বাস্তবতার কণ্ঠস্বর আরও অন্ধকারে তলিয়ে যায়।
মাটির মালিকানা, মানুষের অধিকার, বিকৃত সত্য, মানবিকতার অবক্ষয় এবং প্রতিরোধের সূক্ষ্ম সুর মিলিয়ে ‘ভূমিসূত্র’ হয়ে ওঠে এক কাব্যিক প্রতিবাদ।
দর্শকের প্রতিক্রিয়া:
নাটক শেষে দর্শকদের মধ্যে ছিল আবেগ ও সন্তুষ্টি। পর্যটন শহর কক্সবাজারে টিকিট কেটে মঞ্চনাটক দেখার একটি ইতিবাচক প্রবণতাও চোখে পড়েছে। অনেক দর্শক জানান, দীর্ঘদিন পর কক্সবাজারে এমন চিন্তাশীল ও দায়বদ্ধ নাটক দেখতে পেরে তারা আনন্দিত।
দর্শক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের নাটক শুধু বিনোদন দেয় না, সমাজকে বুঝতে শেখায়। কক্সবাজারে নিয়মিত মঞ্চনাটক হওয়া খুব প্রয়োজন।’
নাসরিন আক্তার বলেন, ‘নাটকটি আমাদেরই গল্প বলে মনে হয়েছে। জমি, মানুষ আর ক্ষমতার সম্পর্ক খুব কাছ থেকে তুলে ধরা হয়েছে।’
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নাটক শেষ হওয়ার পরও সেটি মাথার ভেতরে রয়ে যায়। এটাই ভালো নাটকের শক্তি।’
উদীচীর কাছে প্রত্যাশার কথা জানিয়ে দর্শক রুবেল চৌধুরী বলেন, ‘নাটক হোক গণমানুষের। যারা কথা বলতে পারে না, মঞ্চে তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা হোক।’
দর্শকদের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে কক্সবাজারের সাংস্কৃতিক সংগঠক আশরাফুল হুদা সিদ্দিকী জামশেদ বলেন, ‘ভূমিসূত্র’ শুধু একটি নাট্যপ্রযোজনা নয়; এটি কক্সবাজারের মঞ্চসংস্কৃতি ফিরে আসার এক শক্ত বার্তা। মানুষের সঙ্গে মাটির সম্পর্ক, অধিকার ও বঞ্চনার গল্পকে কাব্যিক কিন্তু নির্মম বাস্তবতায় তুলে ধরে নাটকটি সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে।

আপনার মতামত লিখুন