মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আর ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানের গর্জন নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই এক অভাবনীয় যান্ত্রিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ল মার্কিন বিমান বাহিনী। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ হিসেবে পশ্চিম ইরাকের আকাশে ওড়ার সময় বিধ্বস্ত হয়েছে মার্কিন সামরিক শক্তির অন্যতম স্তম্ভ— একটি ‘KC-135 রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট’।
যুদ্ধবিমানের প্রাণশক্তি জোগানো এই বিশালকার জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের পতন কেবল কারিগরি ক্ষতিই নয়, বরং ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল কৌশলগত ও মানসিক ধাক্কা। কোনো শত্রুভাবাপন্ন দেশের হামলা ছাড়াই মাঝ-আকাশে দুই বিমানের এই সম্ভাব্য সংঘর্ষ এখন পেন্টাগনের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া করে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে নিশ্চিত করে যে, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযান চলাকালীন ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশালাকার জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান (Refueling Aircraft) বিধ্বস্ত হয়েছে।
‘বিমানে থাকা আরোহীদের মধ্যে কেউ বেঁচে আছেন কি না বা প্রাণহানি ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানা যায়নি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের একটি KC-135 রিফুয়েলিং (জ্বালানি সরবরাহকারী) বিমান নিখোঁজ বা বিধ্বস্ত হওয়ার বিষয়ে সেন্ট্রাল কমান্ড অবগত আছে।’
২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে মার্কিন বিমান বাহিনীর বেশ কিছু রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট। ছবি : সংগৃহীত।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি চলাকালীন বন্ধুভাবাপন্ন আকাশসীমায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে এবং বর্তমানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
বিবৃতিটির ভাষা থেকে ধারণা করা হচ্ছে যে, এই দুর্ঘটনায় দুটি বিমান জড়িত ছিল; সম্ভবত সেগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটেছে অথবা খুব কাছ দিয়ে উড্ডয়ন (Close manoeuvres) করার সময় এই বিপত্তি ঘটে। তবে, দ্বিতীয় বিমানটি ‘নিরাপদে অবতরণ করেছে’ বলে জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও স্পষ্ট করা হয় যে, ‘এই দুর্ঘটনা শত্রুভাবাপন্ন কোনো পক্ষের হামলা (Hostile fire) কিংবা নিজেদের বাহিনীর ভুল নিশানার (Friendly fire) কারণে ঘটেনি।’
এই বিমান দুর্ঘটনার আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, চলমান এই সামরিক অভিযানে তাদের সাতজন সদস্য নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে আরও ১৪০ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে আটজনের আঘাত গুরুতর বলে জানিয়েছেন পেন্টাগন মুখপাত্র শন পারনেল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার পর থেকে বৃহস্পতিবারের এই বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য সবশেষ বড় ধাক্কা।
সেন্ট্রাল কমান্ড নিশ্চিত করেছে যে, বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই দুর্ঘটনাস্থলে একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে। তবে দুর্গম এলাকা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে উদ্ধার কাজ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চালানো হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত বিমানে থাকা আরোহীদের (সাধারণত তিন থেকে চার জন ক্রু সদস্য থাকেন) ভাগ্য সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্যে বড় ধরনের বিস্ফোরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র একদিন পর ১ মার্চ, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ (নিজেদের বা মিত্রদের ভুল নিশানায় হামলা) ঘটনায় তিনটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল।
সেন্ট্রাল কমান্ড ওই সময় ব্যাখ্যা দিয়েছিল যে, ইরানের পাল্টা হামলার ফলে সৃষ্ট যুদ্ধকালীন উত্তেজনার মধ্যে কুয়েতি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভুলবশত তিনটি ‘F-15E স্ট্রাইক ইগল’ যুদ্ধবিমানকে গুলি করে নামিয়েছিল।
তবে সেই ঘটনায় যুদ্ধবিমানগুলোতে থাকা ছয়জন ক্রু সদস্য নিরাপদে নিজেদের বের করে নিতে (Eject) সক্ষম হয়েছিলেন এবং পরে তাদের স্থিতিশীল অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
উড়ন্ত ফুয়েল স্টেশন : বিপদের মুহূর্তে কীভাবে যুদ্ধবিমানগুলোর ‘ত্রাতা’ হয়ে কাজ করে কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমান / ছবি : সংগৃহীত
এক নজরে : KC-135 রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট
KC-135 Stratotanker হলো মার্কিন বিমান বাহিনীর আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান চালিকাশক্তি। এটি মূলত একটি ‘উড়ন্ত ফিলিং স্টেশন’, যা যুদ্ধের ময়দানে থাকা যুদ্ধবিমানগুলোকে মাঝ-আকাশে জ্বালানি সরবরাহ করে তাদের দীর্ঘক্ষণ আকাশে থাকতে সাহায্য করে।
এটি আকাশে ওড়া অবস্থায় বোমারু বিমান (Bomber) এবং ফাইটার জেটের ট্যাঙ্কে জ্বালানি ভরে দেয়। ফলে যুদ্ধবিমানগুলোকে বারবার মাটিতে নামতে হয় না, যা যুদ্ধের কৌশলে বড় সুবিধা দেয়।
এটি প্রায় ৯০,০০০ কেজি (২ লাখ পাউন্ড) পর্যন্ত জ্বালানি বহন করতে পারে। এই বিমানের পেছনের দিকে একটি লম্বা নল বা ‘বুম’ (Flying Boom) থাকে, যার মাধ্যমে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অন্য বিমানের জ্বালানি ট্যাঙ্কের মুখে সংযোগ দেওয়া হয়।
জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি এটি প্রায় ৩৭,০০০ কেজি মালামাল অথবা ৮৩ জন সশস্ত্র সেনা বহন করতে সক্ষম।
ইরাক বা ইরানের মতো বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রে যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে টহল বা হামলা চালাতে হয়, সেখানে এই রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট ছাড়া আধুনিক বিমান বাহিনীর টিকে থাকা অসম্ভব।
একটি KC-135 বিমানের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩৯.৬ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪৬০ কোটি টাকা)। এটি বিধ্বস্ত হওয়া মানে মার্কিন বাহিনীর জন্য একই সঙ্গে বড় আর্থিক লোকসান এবং কৌশলগত শূন্যতা। কারণ, এই রিফুয়েলিং বিমানগুলো ছাড়া ফাইটার জেটগুলো দীর্ঘ সময় আকাশে টহল দিতে পারে না।
তেহরানে গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা চলাকালীন ক্ষতিগ্রস্ত একটি আবাসিক ভবনের উল্টোদিকে ধ্বংসস্তূপের ওপর বসে আছেন এক নারী। ছবি : সংগৃহীত।
ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ইরাকের পশ্চিমাঞ্চল যেখানে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে, সেখানে ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের আনাগোনা থাকায় এলাকাটি বেশ সংবেদনশীল। মার্কিন প্রশাসন চেষ্টা করছে উদ্ধার অভিযান দ্রুত শেষ করে বিমানের ব্ল্যাক বক্স বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নিতে, যাতে তা ভুল হাতে না পড়ে।
ঘরে-বাইরে চাপে হোয়াইট হাউস
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ মার্কিন জনগণের কাছে মোটেও জনপ্রিয় নয়। বিভিন্ন জনমত জরিপ দেখাচ্ছে, গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিই প্রথম কোনো যুদ্ধ যা শুরু থেকেই নেতিবাচক রেটিং পেয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, ৯ মার্চ প্রকাশিত কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের (Quinnipiac University) একটি জরিপে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেছেন। আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ৭৪ শতাংশ নাগরিক মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে সরাসরি মার্কিন সেনা মোতায়েন বা ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ (ground operations)-এর ধারণাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
অন্যান্য জরিপেও একই ধরনের ফলাফল এসেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপসোস (Ipsos)-এর তথ্য অনুযায়ী, ৪৩ শতাংশ আমেরিকান এই হামলার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, যেখানে মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ এটিকে সমর্থন জানিয়েছেন। বাকিরা এই অভিযানের বিষয়ে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।
এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যেও এই যুদ্ধ নিয়ে বিভাজন দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প বারবার এই সামরিক হামলাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য’ বলে উপস্থাপন করলেও তার দলের অনেক সমর্থক তা মানতে নারাজ।
জনপ্রিয় টক-শো সঞ্চালক টাকার কার্লসনের মতো প্রভাবশালী রক্ষণশীল ব্যক্তিত্বরাও এই যুদ্ধের পেছনের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন / ছবি : সংগৃহীত।
টাকার কার্লসনের মতো প্রভাবশালী রক্ষণশীল ব্যক্তিত্বরাও এই যুদ্ধের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কার্লসন এমনকি এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে, উপদেষ্টারা সম্ভবত ট্রাম্পকে ভুল বুঝিয়ে এই যুদ্ধের পথে ঠেলে দিয়েছেন।
ট্রাম্পের বিষয়ে টাকার কার্লসন বলেন, ‘তাকে (ট্রাম্পকে) এমন সব জনমত জরিপ দেখানো হচ্ছে যেখানে বোঝানো হচ্ছে যে, এই যুদ্ধ তার জন্য ৯০-১০ ব্যবধানের এক বিশাল বিজয় বয়ে আনবে।’
এবিসি নিউজকে (ABC News) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কার্লসন এতটাই আক্রমণাত্মক ছিলেন যে, তিনি এই যুদ্ধকে ‘পুরোপুরি জঘন্য এবং পৈশাচিক’ বলে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্পও দমে যাওয়ার পাত্র নন; তিনি তার সমালোচকদের কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনকি কার্লসনের মতো যারা নিজেদের ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (MAGA) আন্দোলনের অংশ মনে করেন, তাদেরও তিনি ছাড় দেননি। এবিসি নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ‘মাগা (MAGA) মানে হলো আমেরিকা ফার্স্ট (সবার আগে আমেরিকা), আর টাকার কার্লসন এর ধারের কাছেও নেই।’
তবে প্রেসিডেন্ট ও তার প্রশাসন জনমনে এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে হিমশিম খাচ্ছে। কেন এই সামরিক অভিযান প্রয়োজন ছিল, তার সপক্ষে তারা নানারকম যুক্তি দেখালেও সাধারণ মানুষকে তা খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারছে না।
লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে চরম উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর আগুনের গোলপিণ্ড ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ছে। ছবি : রয়টার্স।
এক জনসভায় ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরানকে যদি এখনই মোকাবিলা করা না হতো, তবে বিশ্বে ‘পারমাণবিক যুদ্ধ’ শুরু হয়ে যেত। অন্য একটি অনুষ্ঠানে তিনি যুক্তি দেখান যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার লক্ষ্যে করা সব আলোচনা ছিল পণ্ডশ্রম; যদিও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দাবি ছিল যে তারা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন।
চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল হামলা চালাতে যাচ্ছে— সেটি ‘জানতে পেরেই’ যুক্তরাষ্ট্র আগেভাগে আক্রমণ শুরু করে। যদিও পরে তিনি নিজের এই মন্তব্য থেকে সরে আসেন।
এই যুদ্ধের ভয়াবহতায় এখন পর্যন্ত সাতজন মার্কিন সেনার পাশাপাশি আনুমানিক ১,৩৪৮ জন ইরানি এবং ১৫ জন ইসরায়েলি প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় দেশগুলোতে আরও ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সূত্র : আল-জাজিরা।
আপনার মতামত লিখুন