৪০০০ কিমি দূরের মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, যুদ্ধের পরিসর বাড়াচ্ছে ইরান
ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। এটির দূরত্ব ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার।
এক মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে সিএনএন জানায়, স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি নিক্ষেপ করা হয়। তবেকোনো ক্ষেপণাস্ত্রই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানেনি।
দিয়েগো গার্সিয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভারত মহাসাগরের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট এক দ্বীপ ‘দিয়েগো গার্সিয়া’। চাগোস দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম এই দ্বীপ সাধারণ মানচিত্রে খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে সামরিক কৌশলের দিক থেকে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান।
বিবিসি বলছে, দিয়েগো গার্সিয়া মূলত যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি যৌথ সামরিক ঘাঁটি। নিকটতম জনবসতিপূর্ণ স্থলভাগ থেকে এটি প্রায় ১ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। দুর্গম অবস্থানের কারণে এখানে সাধারণ বেসামরিক মানুষের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্য ঘাঁটিটি যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহারের অনুমতি দেয়। বিশেষ করে ব্রিটিশ স্বার্থ বা নাগরিকদের ওপর ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে এবং ‘ডিফেন্সিভ অপারেশন’ বা আত্মরক্ষামূলক অভিযানের জন্য এটি ব্যবহার হচ্ছে।
গত শুক্রবার এক বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে ইরান শাসিত ‘হরমুজ প্রণালি’ লক্ষ্য করে হামলা চালানোর জন্য এই ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের চূড়ান্ত অনুমতি পায় মার্কিন বাহিনী।
ইরান থেকে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের খবরটি সামরিক বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কারণ হলো, এখান থেকে মার্কিন বি-৫২ ও বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমান দূরপাল্লার মিশনে উড্ডয়ন করে; এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মাঝামাঝি অবস্থানে হওয়ায় এটি পুরো ভারত মহাসাগরের নৌপথ নিয়ন্ত্রণের ‘স্নায়ুকেন্দ্র’ এবং এখান থেকেই মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ওপর সার্বক্ষণিক স্যাটেলাইট ও রাডার নজরদারি চালানো হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘দিয়েগো গার্সিয়া’ লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষিত একটি দুর্গে আঘাত। এই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ এবং এখান থেকে পরিচালিত আক্রমণই হয়ত নির্ধারণ করবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পরবর্তী গতিপথ।
যুদ্ধের পরিসর বাড়াচ্ছে ইরান
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, দিয়েগো গার্সিয়াকে নিশানা করা ইরানের সমরাস্ত্রের দীর্ঘ পাল্লার সক্ষমতাকে সামনে এনেছে। ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার বলেন, এই হামলা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের বিপরীতে ইরানের পাল্টা জবাবের গভীরতা প্রকাশ করে।
এলিজা আল জাজিরাকে বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্র ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। আর এমনটা ঘটলে উত্তেজনার নিয়ন্ত্রণ, যা যুক্তরাষ্ট্র চায় তা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, নতুন স্থাপনা, নতুন অবস্থান এখন ঝুঁকিতে পড়ছে।’
এই সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে পুরো কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ, ইরান কোনো প্রথাগত যুদ্ধে জেতার চেষ্টা করছে না। প্রথাগত যুদ্ধে তারা পারবেও না, কারণ যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি শক্তিশালী। বরং ইরান যুদ্ধের ব্যয়ের সমীকরণ বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।’
এলিজা বলেন, ‘একটি দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুকে হুমকির মুখে ফেলার মাধ্যমে এই সংকেত দেওয়া হচ্ছে যে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার অর্থ হবে ক্রমাগত উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া।’

আপনার মতামত লিখুন