রাউজানে বিএনপির মনোনয়নে আলোচনায় ১৮ খুন, ৩২ গুলি
বছরজুড়ে খুন ও গুলির ঘটনায় উত্তপ্ত থাকা রাউজান ভোটের মাঠেও আছে আলোচনায়। শেষ মুহূর্তে প্রার্থী বদল করেছে বিএনপি। ৫ আগস্টের পর যে দুজনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, মনোনয়ন পেয়েছেন সেই দুজনই। প্রথমে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বদলে রোববার রাতে মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন গোলাম আকবর খোন্দকার। তবে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির আসল প্রার্থী কে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। আরও দুটি আসনে প্রার্থী বদল হলেও অন্যত্র এমন দৃশ্য নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘রাউজান আসনে আপাতত গোলাম আকবর ও গিয়াস উদ্দিন কাদের উভয়ে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে থাকবেন। প্রত্যাহারের সময় একজনকে চূড়ান্ত করা হবে। আরেকজনকে প্রত্যাহার করতে বলা হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড, জনপ্রিয়তা ও এক পরিবার এক প্রার্থী নীতি বিবেচনায় এনে নতুন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে দল।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পছন্দের আসন ছিল চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-ডবলমুরিং)। শেষ মুহূর্তে তাঁকে সরিয়ে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে সাঈদ আল নোমানকে। রাজনীতিতে তিনি নবাগত। সংসদ নির্বাচনও করছেন তিনি এই প্রথম। একইভাবে প্রার্থী বদল হয়েছে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনেও। তিনটি আসনে প্রার্থী বদল হওয়ায় এর প্রভাব পড়বে চারটি আসনের ভোটের সমীকরণে।
আওয়ামী লীগ আমলে প্রায় আট বছর কারাভোগ করা আসলাম চৌধুরীকে প্রথমে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি সীতাকুণ্ডে। এর প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন তাঁর অনুসারীরা। আসলাম চৌধুরী এককভাবে নির্বাচন করারও ঘোষণা দেন। শেষে প্রার্থী বদল হয়েছে এখানে। এখন আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ায় চ্যালেঞ্জে পড়বেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিক। বন্দর-পতেঙ্গা আসনেও জামায়াতের প্রার্থী শফিউল আলমের চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছেন আমীর খসরু। এই দুটি আসনে জামায়াত যাদের প্রার্থী করেছে, তাদের তুলনায় প্রভাবশালী বিএনপির এ দুই নেতা।
প্রার্থী বদলে সীতাকুণ্ড ও হালিশহরে সমীকরণে প্রভাব
সীতাকুণ্ডে কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের পরিবর্তে বিএনপির নতুন প্রার্থী চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরী। তাঁর মনোনয়নে এখানে পাল্টে যাবে ভোটের সমীকরণ। সীতাকুণ্ড এলাকার বাসিন্দা সেকান্দর হোসাইন বলেন, ‘মনোনয়ন ঘিরে সীতাকুণ্ড আসনে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে বিএনপি। নির্বাচন পর্যন্ত এটি বহাল থাকলে ভোটের মাঠে সুফল যেত জামায়াতের ঘরে। আসলাম চৌধুরী মনোনয়ন পাওয়ায় সালাউদ্দিনের অনুসারীরা এখন দলের পক্ষে কাজ করতে পারেন।’
জানতে চাইলে আসলাম চৌধুরী বলেন, ‘জামায়াতের বিরুদ্ধে জিততে হলে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। কাজী সালাউদ্দিনও প্রার্থী হিসেবে যোগ্য। তাঁর সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ।’
কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পরপর চারবার চট্টগ্রাম-১১ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবারে তিনি চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী) আসনে গিয়ে ১১ আসনের প্রার্থী করাতে চেয়েছেন ছেলেকে। তাঁর ছেলে বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু চৌধুরী। এ কারণে এই আসনে এতদিন প্রার্থীও চূড়ান্ত করতে পারেনি বিএনপি। কারণ, এখান থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী প্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান মঞ্জুও। কোনোভাবে ইসরাফিল খসরু যদি মনোনয়ন পেতেন, তাহলে তাঁর বিপক্ষে কাজ করতেন নাজিমুরের অনুসারীরা। এটির সুবিধা পেতেন এই আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী। আমীর খসরুকে এই আসনে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে কোন্দল দূর করতে পেরেছে বিএনপি– এমনটা মনে করেন নাজিমুর রহমান মঞ্জু।
প্রার্থী মনোনয়নে আলোচনায় রাউজানের ১৮ খুন
গত ১৬ মাসে রাউজানে ১৮ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ছিল ১৩টি। যারা খুন হয়েছেন, তারা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী কিংবা গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারী ছিলেন। আধিপত্য বিস্তার এবং বালুমহাল ও পাহাড় কাটার মাটি নিয়ে দ্বন্দ্বে লাশ পড়েছে। এ ছাড়া গত ১৬ মাসে গুলি বিনিময়ের ৩২টি ঘটনায় অর্ধশত লোক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
সর্বশেষ ৫ নভেম্বর কোয়েপাড়া গ্রামে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন। গত ২৫ অক্টোবর তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চারাবটতল এলাকায় যুবদল নেতা আলমগীর আলমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হন। ৬ জুলাই কদলপুর ইউনিয়নে গুলিতে ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব মো. সেলিম নিহত হন। এ সময় এক যুবদলকর্মী গুলিবিদ্ধ হন। ২২ এপ্রিল সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গাজীপাড়ায় যুবদলকর্মী মো. ইব্রাহীমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন কদলপুরে একজন অটোরিকশাচালক গুলিবিদ্ধ হন। গত ১৯ এপ্রিল রাউজানের বাগোয়ানে যুবদল নেতা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ মানিককে মুখে বন্দুক ঢুকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ সময় নিহতের এক সহযোগীও গুলিবিদ্ধ হন। ২৪ জানুয়ারি নোয়াপাড়ায় চাক্তাইয়ের শুঁটকি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় তাঁর ভাগনেও গুলিবিদ্ধ হন।
১৫ ফেব্রুয়ারি পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর গুজরা গ্রামে সাবেক ছাত্রদল নেতা পেয়ার মুহাম্মদ বাবু, ১২ অক্টোবর নোয়াপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের দুই কর্মী– মাসুদ পারভেজ ও মুহাম্মদ সাগর, ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর কদলপুর ইউনিয়নে আনোয়ার হোসেন বাচলু, ৭ সেপ্টেম্বর নোয়াপাড়া পথেরহাট বাজারে মো. ফরিদ, ১৪ নভেম্বর নোয়াপাড়া ইউনিয়নে দুপক্ষের সংঘর্ষে মো. জসিম উদ্দিন, মো. মহিউদ্দিন, জানে আলম ও তাঁর ভাই মো. সাইফুদ্দিন, মো. লাভলু, নুরুদ্দিন ও তাঁর ভাই মো. মানিক, মো. মাসুদ, আলাউদ্দিন, মো. হুমায়ুন ও নুরুল আবসারকে গুলি করা হয়।

আপনার মতামত লিখুন