নিকোলাস মাদুরো ও আধিপত্যবাদী মার্কিন নীতির নগ্ন মুখ
নিজেকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার বিশ্বরক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে যুক্তরাষ্ট্রের জুড়ি নেই। বক্তৃতায় নৈতিকতা, ঘোষণায় মানবিকতা—সবই আছে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতির ময়দানে এই মুখোশ যতই ঝকঝকে হোক, ভেতরের চেহারা ক্রমেই নগ্ন হয়ে উঠছে। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই নগ্নতারই সর্বশেষ ও সবচেয়ে ভয়ংকর উদাহরণ।
অন্যায়ভাবে ভেনিজুয়েলায় নজির বিহীন হামলার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র অপহরণ করে নিয়ে গেছে।যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন তুলেছে। এটি কেবল ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে আগ্রাসন নয়; এটি গোটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মুখে সপাটে চপেটাঘাত। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাহস্তক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলো যদি এভাবে ভেঙে পড়ে, তবে বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তিই বা কোথায় দাঁড়ায়?
গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী রাষ্ট্র যদি অন্য দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে এভাবে তুলে নিতে পারে, তাহলে গণতন্ত্র শব্দটির আর কোনো নৈতিক ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে কি? আরও বড় প্রশ্ন হলো—এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোথায়? আন্তর্জাতিক আইন কোথায়? নাকি পরাশক্তির ক্ষেত্রে আইন প্রযোজ্য নয়, আর দুর্বল রাষ্ট্রের জন্যই কেবল নিয়ম?
যদিও এটি নতুন কিছু নয়। লাতিন আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন আধিপত্যবাদী নীতির পরীক্ষাগার। কখনো সামরিক অভ্যুত্থান, কখনো অর্থনৈতিক অবরোধ, কখনো নির্বাচিত সরকারকে অবৈধ ঘোষণার কৌশল—সবই পুরোনো রেসিপি। নিকোলাস মাদুরো সেই ধারাবাহিকতারই আরেক নাম। ভেনিজুয়েলার অপরাধ একটাই—তারা ওয়াশিংটনের নির্দেশে দেশ চালাতে রাজি নয়।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছেন। তার শাসনামলে কূটনৈতিক ভদ্রতার মুখোশ অনেকটাই ঝরে পড়েছে; নগ্ন ক্ষমতার ভাষাই হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রনীতির প্রধান হাতিয়ার। জাতিসংঘের প্রস্তাব উপেক্ষা, আন্তর্জাতিক চুক্তিকে তুচ্ছ করা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত—সবকিছু মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত প্রমাণ করেছে যে তাদের কাছে আন্তর্জাতিক আইন কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, বরং সুবিধামতো ব্যবহারের একটি বিকল্প মাত্র।
মার্কিন নীতির সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি লুকিয়ে আছে তাদের দ্বিমুখী মানদণ্ডে। মধ্যপ্রাচ্যে বা অন্যত্র স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলতে কোনো দ্বিধা নেই, অথচ লাতিন আমেরিকায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রেসিডেন্ট হলেই তিনি ‘স্বৈরাচারী’। মানবাধিকার এখানে নীতি নয়, বরং রাজনৈতিক অস্ত্র—যা ব্যবহার হয় কেবল প্রয়োজন অনুযায়ী। এই দ্বিচারিতাই জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থাকে ক্রমশ অর্থহীন করে তুলছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক শ্বাসরোধের কৌশল। ভেনিজুয়েলার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশটির অর্থনীতি কার্যত পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে, যার মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি—সবকিছুর সংকটে ভুগেছে জনগণ। অথচ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও এসব নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো বৈশ্বিক প্রতিরোধ দেখা যায় না। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সংকট তৈরি করা, তারপর সেই সংকট দেখিয়ে নৈতিকতার ভাষণ—এটাই আধিপত্যবাদী রাজনীতির চিরচেনা চক্র।
তবে ইতিহাস এক জায়গায় স্থির থাকে না। একক পরাশক্তির দাপট আজ আর আগের মতো অপ্রতিরোধ্য নয়। নতুন শক্তির উত্থান, আঞ্চলিক জোটের সংহতি এবং বৈশ্বিক জনমতের পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিশ্ব আর জোরের রাজনীতি মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনা সেই পরিবর্তনেরই আরেকটি সতর্ক সংকেত, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা।
আধিপত্যবাদী মার্কিন নীতির পতন মানে বিশৃঙ্খলা নয়; বরং এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সম্ভাবনা। এমন এক বিশ্ব, যেখানে শক্তি নয়—আইন কথা বলবে; যেখানে জাতিসংঘ পরাশক্তির হাতিয়ার নয়, বরং সত্যিকার অর্থে বৈশ্বিক ন্যায়ের মঞ্চ হবে; আর যেখানে জনগণের ভোট কোনো পরাশক্তির ইচ্ছার কাছে তুচ্ছ হবে না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে সাম্রাজ্য অন্যের স্বাধীনতা পদদলিত করে, আন্তর্জাতিক আইনকে অবজ্ঞা করে এবং বিশ্বব্যবস্থাকে নিজের ইচ্ছেমতো বাঁকাতে চায়, তার পতন অনিবার্য। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য ক্ষমতালোভী কূটনীতি এবং নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে বিতর্কিত এই ঘটনা সেই পতনেরই আরেকটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। প্রশ্ন শুধু একটাই—বিশ্ব কি এবার সত্যিই ন্যায় ও আইনের পক্ষে দাঁড়াবে, নাকি নীরবতার মধ্য দিয়েই আধিপত্যকে বৈধতা দিয়ে যাবে?
###
লেখক সম্পাদক টেলিগ্রাম নিউজ

আপনার মতামত লিখুন